Friday, May 8, 2026
Homeসবিশেষগল্পএকজন বোবা বিক্রেতা । আহমদ সায়েম

একজন বোবা বিক্রেতা । আহমদ সায়েম

আমি খোঁজতে বেরিয়েছিলাম আমাকে—
নিজের ভেতরের সেই অদৃশ্য মানুষটাকে, যে কখনো আয়নায় ধরা পড়ে না, কিন্তু সবসময় চোখের ভেতর লেগে থাকে।
খোঁজতে খোঁজতে তোমাকে পেয়ে গেলাম।
অদ্ভুতভাবে, তোমার কাছে আসাটাই যেন আমার নিজের দিকে ফিরে আসা।

আমি তোমার সামনে বসি।
চুপচাপ।
তুমিও চুপ—বোবা বিক্রেতা, তবু তোমার চারপাশে শব্দের ভিড়।
আমি দেখি—আলো। অন্ধকার।
কেউ বাতাসে আলো নিয়ে খেলা করছে—
আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে দিচ্ছে ঝলক, যেন সত্যও একধরনের খেলনা।
আবার কেউ বাতাসই বিক্রি করছে আলোর কাছে—
যেন আলোও নিজে টিকে থাকতে কারো শ্বাস ধার নেয়।

অন্ধকার বিক্রি হচ্ছে খুব সস্তায়।
নামমাত্র মূল্যে।
যারা কিনছে, তারা হয়তো জানেই না—
অন্ধকার কখনো একা আসে না, সঙ্গে করে নিয়ে আসে গভীরতা, ভয়, আর এক ধরনের নিঃশব্দ সত্য।

আমি আমার শৈশব কিনতে চেয়েছিলাম।
হাত বাড়িয়ে বলেছিলাম—“ওটা দাও, যেটা হারিয়ে গেছে।”
কেউ তা বিক্রি করে না।
কারণ শৈশব কোনো পণ্যে বাঁধা পড়ে না—
ওটা শুধু হারায়, ফিরে আসে না;
অথবা ফিরে এলেও, অন্য কারো স্মৃতিতে, অন্য এক নামে।

তুমি যে কী বিক্রি করো,
তার হিসাব নিতে নিতে
আমি সংখ্যাগুলো ভুলে যাই,
তারপর ধীরে ধীরে—নিজেকেও।

তুমি কি আমি?
না আমিই তুমি?

আমি খুঁজি আমাকে।
কিন্তু তোমার দিকে তাকালেই মনে হয়—
আমি কি ভুল ঠিকানায় চলে এসেছি?
নাকি এটাই সেই জায়গা, যেখানে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে,
আর অন্য কাউকে খুঁজে পায়,
যে আসলে তারই অন্য রূপ?

তোমার কাছে যেতে যেতে
আমি আমাকেই দেখতে পাই—
ভাঙা আয়নার মতো, খণ্ড খণ্ড প্রতিচ্ছবি,
যেখানে প্রতিটা টুকরোই সত্য, আবার কোনোটাই সম্পূর্ণ নয়।
প্রশ্ন জাগে—
তুমি আসলে কে?

তুমি কি সেই বাতাস বিক্রেতা,
যে শূন্যতাকে মোড়কে বেঁধে মানুষকে স্বস্তি দেয়?
না কি তুমি অন্ধকার,
যে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে আলোর ভাষায়?

তুমি যে কী বিক্রি করো,
তার হিসাব নিতে নিতে
আমি সংখ্যাগুলো ভুলে যাই,
তারপর ধীরে ধীরে—নিজেকেও।

তুমি কি আমি?
না আমিই তুমি?

নাকি আমরা দু’জনেই সেই বোবা বিক্রেতা—
যে কিছুই বলে না,
তবু সবকিছু বিক্রি করে দেয়—
নামহীন অনুভূতি, অচেনা ভয়, আর অর্ধেক সত্যের বিনিময়ে
পূর্ণ এক বিভ্রম?

২১ মার্চ ২০২৬

আহমদ সায়েম
আহমদ সায়েমhttp://raashprint.net
জন্ম ১৯৭৮ সালের ৫ জানুয়ারি, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী শহর সিলেটে। তবে তাঁর বংশপরিচয়ের সূত্র টানলে ফিরে যেতে হয় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’র কাছে-যার পারিবারিক রক্তধারা তাঁর শরীরেও বহমান। শৈশব ও বেড়ে ওঠার স্মৃতিতে সিলেট যেমন একটি ভৌগোলিক নাম, তেমনি একটি সাংস্কৃতিক ও আবেগী পরিমণ্ডল। বর্তমানে তিনি পেশাগত কারণে সপরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তিনি বিষাদমুক্ত জীবনবোধে আস্থাশীল, ভ্রমণপ্রিয় এবং বন্ধুবৎসল মানুষ হিসেবে পরিচিত। বহুমাত্রিক সৃজনশীলতায় সক্রিয় সায়েম একাধারে কবি, সম্পাদক, পুস্তকপ্রকাশক, স্থিরচিত্রগ্রাহক এবং স্বতঃপ্রণোদিত তথ্যচিত্রনির্মাতা। আবির্ভাবকাল অনুযায়ী তিনি একবিংশ শতকের প্রথম দশকের লেখকপ্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি- অনক্ষর ইশারার ঘোর (২০১৫), কয়েক পৃষ্ঠা ভোর (২০১৯) এবং রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ (২০২৫)। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ The Layers of Dawn। প্রকাশিতব্য দুইটি কবিতার বই রয়েছে, যা খুব শীঘ্রই বের করার প্রস্তুতি চলতেছে। একটি ‘কবিতার খাতায় আঁকা ফিুড়ং’ এবং ‘আব্বার আনন্দবাজার’ নামে। তিনি সম্পাদনা করছেন সাহিত্যপত্র সূনৃত এবং ওয়েবম্যাগ রাশপ্রিন্ট। ছোটকাগজ সম্পাদনার জন্য ২০১৩ সালে তিনি অর্জন করেন ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস’ সম্মাননা। প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী ফিলাডেলফিয়ায় ‘বইমেলা২০২৫’ মতো একটি আয়োজন, যার সাথে তিনিও আয়োজকদের একজন ছিলেন। এবং ‘ফিলাডেলফিয়া’ নামের সাহিত্য পত্রিকাটি তিনি সম্পাদনা করেন। সায়েমের নানা বাড়ি হচ্ছে সিলেটের মামনফুর এলাকায়। নানার নাম সৈয়দ মোস্তকিন আলি বিষাদমুক্ত, ভ্রমণপ্রিয়, বন্ধুবৎসল। ফোন : +1 (929) 732-5421 ইমেল: ahmedsayem@gmail.com
এইরকম আরও পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
ad place