Tuesday, March 24, 2026
Homeসবিশেষগদ্যপ্রকাশভঙ্গী নানান ভাবে হতে পারে । ...

প্রকাশভঙ্গী নানান ভাবে হতে পারে । আহমদ সায়েম

পাঠক তার পছন্দের জায়গা থেকেই পড়ে, কেউ সন-তারিখ লাল-নীলের হিসাব নিতে পড়তে বসে, কেউ তথ্য বা তত্ত্ব নিতে আর কেউ সময়ের চিন্তা বা নিঃশ্বাস নিতে পড়ে। কবিতা সব পাঠকের জন্য নয়, সবাই পড়ে না, কবিতা পড়ার জন্য একটু স্থির মস্তিষ্কের প্রয়োজন পড়ে, চোখ দিয়ে সংবাদপত্র পড়া গেলেও কবিতা পড়া যায় না, তা পড়তে হয় দিল দিয়ে, চিন্তা থেকে। ‘রোজেন হাসান’ যার কবিতা আরেকটু বেশি নিরবতা ও মগ্নতা দাবি করে। একই বিষয়ে নানা জনের নানান মত থাকে, দেখার ভঙ্গি থাকে আলাদা, বুঝা-শোনাটাও আলাদাই হয়। কারো মন্তব্যই ‘শেষ কথা’ বলেও কিচ্ছু নেই, যার যার ধারণা বা দেখা থেকে কথা বলে, লেখেও। রোজেন যে ভাষায় বা চিন্তা থেকে কবিতা শুরু করেছেন তা কোনো সহজ পথ নয়। নির্মাণ শৈলী, প্রকাশভঙ্গী একটু আলাদা। পড়তে মুখে আটকায় না, কানেও বাজে না, শুধু আটকায় মননে, বোধে। সমুদ্র দেখতে যতোটা সুন্দর লাগে তার থাবাটা কিন্তু সে মতো নয়, কেউ হাসতে হাসতে ঘরে ফেরে, কারো হাসিতে লবণ মিশ্রিত হয়ে যায়। তখন আমরা কেউ আর সমুদ্রকে বলি না তুই একটা জবা, তুই একটা রক্তবিষ, একটা মদের বোতল বা বেচে থাকার হাজারও চুম্বন…। বলি না কারণ সমস্যাটা সমুদ্রের নয়, কার যে সমস্যা তা বুঝতে পারি না বিধায় দোষ ঢেলে দেই নর্তকীর যিশুরে। আর কথা না বাড়িয়ে তার কয়েকটা কবিতা পড়ি…

তোমার আত্মা যেন সমুদ্রে বসে আছে
নাবিকদের অস্ফুট কল্লোল আর হারানো রামের বোতল
তোমাকে আফ্রিকার লৌকিক নৃত্যের কথা
মনে করিয়ে দেয়।

তুমি শোনো, তোমার শরীর ও ক্রিয়াপদের সাথে সম্পর্ক
তুমি শোনো, তারা বলছে একটি গহনচারী মাছরাঙা
মনোলিথিক ঢেউয়ের শীর্ষে জ্বলছে।

মেটাফর

...

এই সাপজড়ানো কালো হরিৎ, সবুজ পোশাকে মুড়িয়ে নৌকো
এক লাশের আবদার কুড়িয়ে বেয়েছি আমি। যখন ঈষৎ বাঁকানো
নৌকো বাওয়া। প্রতিবিম্বের পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছি
এক ঝাঁক গাদাফুল, সেই তপস্যারত শম্বুকের রুধিরে বিমান। পুষ্পবৃষ্টি ঝরে
এতকাল ধরে প্রতিবিম্ব আমার কাচফুল। ফুটে আছি।

বিস্মৃতি এবং আকার

আমি হচ্ছি সেই অন্ধ তিরেসিয়াস যে অন্ধ কিন্তু যে ভূত-ভবিষ্যৎ
সব দেখতে পায়। সেইসব একলব্যীয় উপাখ্যানে আমার কাটা আঙুল পড়ে আছে।
দ্যাখো সারারাত পিয়ানো বাজিয়েও আমি সকালে তীব্র হায়াসিন্থের কোলে ঢলে পড়ি।
আমি পুনর্জন্ম নিই, বার বার মরে গিয়ে। মৃত্যু আমার কাছে এক ফ্যাশন,
যেমন তোমরা আয়না বদল করো সেইভাবেই আমি মৃত্যু বদল করি।
জীবন তো বদল করার জিনিস কিন্তু জেনো মৃত্যু ব্যক্তিগত
আনকোরা বেহালাবাদিকার ওই সিক্ত প্রবন্ধে লেখা আছে তার রহস্যমোচন।

বেহালাবাদিকা

কবিতা অনেক রকম, চিন্তা ও বোধের বিষয়ও তাই, একই মেলা থেকে ফিরে দশজনের গল্প দশরকমেই থাকে, কবি হয়ত একটা চিন্তা থেকে লেখাটা শেষ করছেন, কিন্তু একই মেজাজ নিয়ে আমিতো পাঠ করতে বসিনি! ফিরতি পাঠের সময় ও স্থান সমন থাকছে না, তাই পুনর্জন্ম নিচ্ছে কথা বলার রঙ-ঢঙ।

আমার হাতে কবির দুইটা বই রয়েছে, পড়তে পড়তে মনে হলো কবি প্রথম দিকের কবিতা গুলো চিন্তাকে শব্দদিয়ে আড়াল করে দিয়েছেন, তা তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন কারণ শেষ বইয়ের কবিতা গুলো উন্মুক্ত বাতাসের গন্ধ পাওয়া যায়।

...

মুহূর্তের গোলাপ শুধু গোলাপ, এর পেছনে
হাজার বিস্মৃতির লাল সমুদ্র, অসংখ্য স্তবগান, সংখ্যাহীন
মৃত্যু, ভোরের বন্দরে নিস্তব্ধতার ঢেউসকল— তার ঘ্রাণে
মিশে যাওয়া, মালভূমির অপার তীক্ষ্ণ হাওয়া, সূর্যের পতনে।
গোলাপ শুধু গোলাপ,
একগুচ্ছ লাল মুহূর্তের জানালা
ভেদ করে আমি উঠে যাই শুধু মুহূর্ত ভাষায়, যার পূর্বে সব
আমার মাঝে ছিল, হারানো।

ভাষার মুহূর্ত

শব্দের মতো বিদ্রোহ আর পাথরের মতো একাকিত্ব
নিয়ে জবাফুল; পুর্ণুঙ্গ হয়ে ওঠে। জবা এক মৎস্যকুমারীর
মতো ভোরে, দুলে ওঠে, হাওয়ায়। তার পালকে রহস্য আর
যৌনতা। জবা যেন এক প্রত্ন নাম। কোমল পাথর যেন ভোরের
টানাগদ্যে রাতের মৌলবাদীটা।

রহস্য থেকে পূজারীরা আসে
রহস্যে ফিরে যান ঈশ্বর—
টেনে নিয়ে যায়, কান্নাভেজা বালিকার মতো
ভোরে এবং
খুব ভোরে
তৃতীয় মাত্রার ঘ্রাণ আর
সতীচ্ছেদ।

 প্রকরণ

‘ভাষার মুহূর্ত’ ও ‘প্রকরণ’ কবিতা দুইটি ‘বিষুব রাত্রির দেরাজ’ বই থেকে নেয়া। শেষ লেখাগুলো আগের চেয়ে একটু ভিন্ন, আমার মনে হলো, জানি না পাঠক আমার সাথে একমত হবেন কিনা, আমি হয়ত লেখকের অনেক গুলো লেখা পড়ার জন্য এমন ভাবতে পারছি, পাঠকের তা মনে নাও হতে পারে। লেখক আমার চিন্তাকে ধরার জন্য লেখেন না, তিনি নিজের মতোই লেখেন, ভাবেন। আমি তার আকাশ দেখার জন্য বা উড়ার জন্য বারে-বার পড়ি…

আহমদ সায়েম
আহমদ সায়েমhttp://raashprint.net
কবি, সম্পাদক, পুস্তকপ্রকাশক, স্থিরচিত্রগ্রাহক ও স্বতঃপ্রণোদিত তথ্যচিত্রনির্মাতা। আবির্ভাবকাল বিবেচনায় একবিংশ শতকের প্রথম দশকের লেখকদলের অন্তর্ভূত। পূর্বপ্রকাশিত কবিতাবই তিনটি : ‘অনক্ষর ইশারার ঘোর’ ২০১৫, ‘কয়েক পৃষ্ঠা ভোর’ ২০১৯, এবং ‘রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ’ ২০২৫; অন্য বই ইংরেজিতে অনুদিত : ‘The layers of Dawn’ ২০১৮ সালে বের হয়েছে। সম্পাদনা করেন সাহিত্যপত্র ‘সূনৃত’ ও ওয়েবম্যাগ ‘রাশপ্রিন্ট’। ছোটকাগজ সম্পাদনায় পেয়েছেন ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস ২০১৩’ সম্মাননা। যুক্তরাষ্ট্রেরে প্রথম রাজধানী ফিলাডেলফিয়া, সেখানে প্রথম ‘বইমেলা ৩১ মে ২০২৫’ করতে সক্ষম হন। ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম বাংলা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ এবং সম্পাদনা করেন ‘ফিলাডেলফিয়া, মে ২০২৫’ নামেই। নাট্যসংগঠনের সঙ্গে সংলিপ্ত। জন্ম ও বেড়ে-ওঠা বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব সীমান্তবর্তী সিলেট শহরে ৫ জানুয়ারি ১৯৭৮ সালে। পেশাসূত্রে সপরিবার বসবাস যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়। বিষাদমুক্ত, ভ্রমণপ্রিয়, বন্ধুবৎসল। ফোন : +1 (929) 732-5421 ইমেল: ahmedsayem@gmail.com
এইরকম আরও পোস্ট
- Advertisment -
ad place