দৈত্য ও অপরূপা
আমি যখন সুন্দরের পাশে দাঁড়াই
তখনই তুমি হও অপরূপা
আমি হই দানব
যেনো দৈত্য ও অপরূপা
চীনে রেস্তোরাঁর অন্ধকারে
সিচুয়ান ফুড
ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত
ভায়োলিনে বিলাপ
আমি যখনই তোমার পাশে দাঁড়াই
মানুষের সব খোলশ আমার খসে পড়ে
এইসব আশাক-পোশাক
টি শার্ট কিংবা জিন্স ফুঁড়ে
আমার ভেতর অমানুষ
দাঁত-মুখ-নোখ বাগিয়ে বড় হয়ে ওঠে
হ্রদের তীরে
আমি তখন নগ্ন হয়ে যাই
আমার ঈষৎ উদ্যত লিঙ্গ
সত্যিই দানবের মতো
সব সুন্দর তাড়িয়ে বেড়ায়
আমি যখন সুন্দরের পাশে দাঁড়াই
তখনই আমার ভেতরে আমার আততায়ী জন্ম নেয়
ভয়ংকর এক কুৎসিত আমাকে ছিন্নভিন্ন করে
আমার ভেতরের তৃষ্ণা মরে যায়
অপরূপা
পৃথিবীর সব সুন্দর আমি এভাবেই তাড়িয়ে বেড়াই
যৌনবিষাদে তোমার ভরেছে কি মন?
স্বমেহনের আনন্দে ভরেছে কি রাত?
প্রিয় যুবতি, হেলান দিও জানালায় এমন তারার রাতে।
বিষন্ন দিন সুরমার জলে পাল তুলিয়াছে।
তুমি তবে মরীচিকা খুঁজে খুঁজে
শরীরের গন্ধে আজ মৌতাত পেলে বুঝি?
কোথায় যুবারা তবে শুয়েছে?
ছইয়ের আড়ালে মাছ ভরা রাতে
রেতপাতে অন্ধকার মিশেছে কি?
ভরা জোৎস্না ধীবরের স্বচ্ছ চোখে
মৎসনারীদের শীষে জলসঙ্গমে
মহুয়ার বনে সন্ন্যাস ফেলেছে ছায়া।
এমন শুভ্র মেঘের রাতে
প্রিয় যুবতি, যৌনবিষাদে তোমার ভরেছে কি মন?
গন্ধবহ প্রাচীনতা পুষ্প
গন্ধবহ প্রাচীনতা পুষ্প, গুহাবাসী আগুনের পাশে ফুটে থাকো;
মরমে নামাও, ক্লিষ্ঠ প্রেতসন্ধ্যার ছবি, যেনো চাঁদ জাগে
অসম্ভব পৃথিবীর পাশে, হিম নিঃসঙ্গতা কালো চাদরের মতো
খেলা করে। প্রাচীনতা পুষ্প, হেয় প্রতিপন্ন আত্না কোন দায়ভাগে
মহাশূন্য কাছে ডাকে? মৃত্যু উপেক্ষায় উপেক্ষায়, সামান্য সংহতি
অশরীরী মনে হয়; জীবনের কাছে এরূপ পরম নেতি, প্রজ্ঞা,
মানুষ আকাঙ্খা করেছিলো?প্রাচীনতা পুষ্প, গন্ধবহ আজো তুমি
গুহাবাসী ভ্রাতৃত্বের, সমবেত প্রার্থনার। তুমি স্নায়ুলব্ধ সজ্ঞা,
শিখিয়েছো শিকারির তূন খুনে আনে বরাভয়, আনে দাবদাহে
মাতামহীর আশ্বাস। মেঘের বিলাপ নামে আবছায়া নিলাম্বরে;
মানবরক্তে বৈদুর্য অস্ত যায়, দূরে সিটি দেয় মহাশূন্যযান,
শুনি অপলাপ দূরাগত, পরমাণু বিষটোপে রিক্ত সমুদ্দুরে।
নির্মাণ সর্বদাই সুন্দর
নির্মাণ সর্বদাই সুন্দর; প্রতিনিয়ত শ্রমিক
মানুষ-প্রকৃতি-প্রাণী। সর্বজগতে যথাবিহিত
প্রয়োজন এভাবেই সাধিত হয় শ্রমে-জীবনে;
উপরন্তু শিল্পে মানুষের যাত্রিজীবন বিম্বিত।
অনিশ্চিত আগামী নির্মিত হয় শ্রমে ও মননে;
জয় আসে নিরন্তর বিপ্লবী-ঐক্যে, পুষ্পে ও ভস্মে।
নীলিমায় গাঁথা চাঁদ, গঙ্গা কিংবা মিসিসিপিজলে
জীবন যাপিত, প্রাত্যহিক অঙ্কুরোদগমে-শস্যে।
মাটি, খনিজ-তরলে, জলে-ভেলায়, দ্রুতধী-অশ্বে,
মহাশূণ্যে-সমরাস্ত্রে, মানবতা চিরআয়ুষ্মতি;
প্রাকৃত-জীবনে কিংবা লেনিনের কালে-মহাকালে
নির্মাণে অন্তরে বাঁচে সামগ্রিক সৃষ্টির প্রণতি।
সমুদ্রে দুপুর
মধ্যদুপুরে সূর্য তখন স্থির জলন্ত সসার।
আমরা সমুদ্র-তীরে; আমাদের পশ্চাতে বিস্তৃত
বন-পল্লব-মর্মর। সম্মুখে অস্থির জলরাশি;
রৌদ্রকরোজ্জ্বল বেলাভূম জুড়ে অনন্ত শূন্যতা।
এক ঝাঁক সামুদ্রিক পাখি ভূমিতে ঘুড়ির ছায়া
ফেলেছে; আমরা বলিতে পা ডুবিয়ে, প্রবল-ক্ষিপ্র
বাতাসে পোশাকের নিশান উড়িয়েছি। আমাদের
খুব কাছে কাঁকড়ার সোনালি সারি, সামনে দূর
দিগন্তে কতিপয় বিদেশি জাহাজ, স্থির চিত্রের
মতো নিরন্তর উড়িয়েছে ধুম্রছায়াময় শৃঙ্গ,
প্রগলভ জ্বালামুখ। আমাদের স্মৃতিগুলো শূন্যে
মরাল; অস্থির হৃদপটে সংক্ষুব্ধ ক্রোধের মতো
ভেঙ্গে যায় বাসনার ফেনারাশি। হাঁটুজলে নেমে
আমাদের একজন, মৌনমুগধ মাউথ-অর্গানে
তুলেছে বিষন্ন সুর, তার করতলে স্মৃতিরেখা,
দুইঠোঁট মনোময়।দ্বিতীয় যে জন সে নিস্পৃহ,
য্যানো অন্তরাত্মা তার কোনোদিন কাঁপেনি করুণ
কোনো প্রাণের বিভায়। একজন ধ্যানি জুতো খুলে
মাটিতে বসেছে, তার দুই কান জল-গর্জনে ও
শব্দে বিভোর, য্যানো বিস্ময় ভেঙ্গে গেছে, চোরাস্রোতে
কলস্বরা আজ পৌরাণিক দেবীর বিলাপ। শুধু
আমারই কোনো স্মৃতি নেই, ধ্যানমিশ্র দ্বি-প্রহরে
প্রাণবন্ত দুই কাঁধে ঝুলিয়েছি আনন্দ-ক্যামেরা;
বিষন্ন নগরে ফিরে যাবার পথে, নিমগ্ন নীল
দিগন্তের ছবি ছাড়া আমি আর কিছুই নেবো না।
. . .

জন্ম সিলেটে। পঞ্চাশ দশকের শেষাশেষি। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা, সোয়ানসি (যুক্তরাজ্য), ও নিউ ইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটিতে। পেশাদার সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন প্রায় এক দশক। নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে বসবাস করেন। প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ : রূপ সিরিজ।
