অনুপল—১৩৬ : অনুপস্থিতি
হাড়িতে ভাত এখনও টগবগ করে ফুটছে
শরীর হিম হয়ে আসে তুমি নেই দেখে।
অনুপল—১৩৭ : প্রেম—২
কী আর বলব…!
কথা ফুরিয়ে গেছে
শুরু হওয়ার আগে।
অনুপল—১৩৮ : প্রেম—৩
বাগানে গোলাপ ফুল তুমি উপড়ে নিয়েছ—
সুগন্ধ শুঁকবে তাই।
আমি উদ্বিগ্ন ভেবে:
নিজের সুগন্ধ তুমি নিজেই উপড়ে নিলে।
অনুপল—১৩৯ : প্রেম—৪
চায়ের কাপে চা জুড়িয়ে এসেছে:
মুখে দিয়ে মনে হল বরফযুগ পান করছি।
অনুপল—১৪০ : প্রেম—৫
তেতো কফির কাপে মাছি উড়ে উড়ে বসছে:
জীবন ভরে আছে প্রেমের সুগন্ধে।
অনুপল—১৪১ : প্রেম—৬
তোমার মুখের দিকে তাকাই:
বিকট শব্দে নক্ষত্র খসে পড়ে কৃষ্ণবিবরে।
অনুপল—১৪২ : পরিণতি
কাবাবদানা মুচমুচে হলেও ওর পরিণতি উদরে।
যতই মুচমুচে হও, তোমার পরিণতি সমাধি।
সিক্তবসনা যেসব যুবতী কলতলায় নিয়মিত ছিলেন
তারা এখন রন্ধনশালায় কুমারীত্ব হারিয়েছেন।
ভাতের ফেনা হাড়িতে উপচে উঠেছে…
বিগত যৌবনারা উদাস সিক্তবসনা দিনগুলোর ভাপে।
অনুপল—১৪৩ : ভয়্যার–১ : ভারমিয়ার
ভারমিয়ারের মতো আমিও ঈক্ষণকামী
আবডালে উঁকি দিয়ে জীবন দেখি।
অনুপল—১৪৪ : ভয়্যার—২ : গোধূলি
রান্নাঘরে কাজের মেয়ে প্যাকেট থেকে দুধ ঢালছে
রক্ত পিচকারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে।
অনুপল—১৪৫ : ভয়্যার—৩ : কলতলার দিনগুলি
সিক্তবসনা যেসব যুবতী কলতলায় নিয়মিত ছিলেন
তারা এখন রন্ধনশালায় কুমারীত্ব হারিয়েছেন।
ভাতের ফেনা হাড়িতে উপচে উঠেছে…
বিগত যৌবনারা উদাস সিক্তবসনা দিনগুলোর ভাপে।
অনুপল—১৪৬ : ভয়্যার—৪ : সম্বর
সম্বরের গন্ধ চুপিসারে ঢুকে পড়েছে
ওর উতলানো অন্তর্বাসে।
চিবুকে ঘনীভূত ক’ফোঁটা ঘামের লবণ
চুপিসারে শুষে নিচ্ছে শুকনা লঙ্কার ঝাঁঝ।
অনুপল—১৪৭ : ভয়্যার—৫ : রজস্বলা
শুকনো অন্তর্বাস রক্তের ডেলায় ভিজে উঠল দেখে
ছাদে কাপড় শুকাতে দেয়া মেয়েটি বিব্রত হাসে।
আকাট মূর্খ এক আবডালে পাখির চোখ করে ওকে দেখছে
—মনে-মনে পুলকিত মেয়েটির হাসির ভুল অর্থ করে।
অনুপল—১৪৮ : ভয়্যার—৬ : পুরুষাঙ্গ
ঈক্ষণকামীর পুরুষাঙ্গ টনটন করে
লুকিয়ে দেখা মেয়েটিকে
পটাতে না পারার দুঃখে।
অনুপল—১৪৯ : কৌতুক
কৌতুকই বটে!
বোমার আঘাতে ছেলেটি মরে সিরিয়ায়।
গজদন্তলোভী চোরাশিকারির গুলিতে সাবাড় হাতি
মুখ থুবড়ে পড়েছে আফ্রিকায়!
অনুপল—১৫০ : নিঃসঙ্গতা—২
সবুজ পুঁইমাচার ওপর বসা গিরগিটি
আমায় দেখতে পেয়েছে।
লজ্জায় আরক্তিম হয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে
পুঁইশাকের আড়ালে।
ওকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন—
আমায় নিঃসঙ্গ দেখে সে লজ্জা পেয়েছে কিনা।
অনুপল—১৫১ : নিঃসঙ্গতা—৩
ছাদের কার্নিশে কাক বসে আছে
আমায় একপলক দেখে নিচ্ছে মনে হয়।
এইমাত্র উড়াল দিল শূন্যে!
নিঃসঙ্গ আমি কি ওর বিচলনের কারণ হলাম?
অনুপল—১৫২ : নিঃসঙ্গতা—৪
ডুমো মাছি দুধের বাটি দখলে নিয়েছে
বেশ বুঝতে পারছি ওর তৃষ্ণা পেয়েছে,
বিড়ালছানার মতো চুকচুক করে দুধ সাবাড়ে ব্যস্ত এখন।
আমায় দেখে নিমেষে উড়ে পালাল।
জানার ইচ্ছে ছিল—
আমার নিঃসঙ্গতা অসহ্য ভেবে ও পালায় কিনা।
অনুপল—১৫৩ : নিঃসঙ্গতা—৫
মশা হুল বসিয়েছে ত্বকে
রক্তের গন্ধ নাকে টের পাচ্ছি
হাত বাড়াতে উড়ে গেল চট করে।
জানতে ইচ্ছে হয়—
ঠিক কতটা রক্ত পান করলে ওর মনে হবে…
আমার নিঃসঙ্গতা সে ঘোচাতে পেরেছে!
অনুপল—১৫৪ : ঘেয়ো কুকুর
কী অদ্ভুত এই জীবন!
শীতের ঝরাপাতা উড়তে-উড়তে
হুমড়ি খেয়ে পড়েছে রাস্তায়।
একটি ঘেয়ো কুকুর ঝরাপাতার দখল নিয়েছে:
নিজের থাবায় ওকে বন্দি করে খেলছে।
টের পাচ্ছি কেন ঘেয়ো কুকর দেখলে
মানুষের কথা মনে পড়ে।
অনুপল—১৫৫ : চা
মুনিয়াকে বলেছি কাল রাতে—
আমি ক্লান্ত কিনা জানতে চেয়ো না,
বরং দুজনে মিলে কড়া লিকারে
এক কাপ চা খাই চলো…
আবার ক্লান্ত হওয়ার আগে।
অনুপল—১৫৬ : ধূমকেতু
চিল অনেক উঁচু থেকে শিকার দেখতে পায়
আমি নিচ থেকে লেজকাটা ধূমকেতু দেখছি
—দ্রুত ধেয়ে আসছে আমায় হরণ করে নিতে।
অনুপল—১৫৭ : ছদ্মবেশ
কীসে মানুষ স্মরণীয়?
—ছদ্মবেশে…।
দাদাজান চোখ টিপেন প্রশ্নের উত্তরে।
কবি কিশওয়ার অপেক্ষায়
গায়েবি দিদার নামবে রাতে।
বিড়ালটি জেগে আছে
গর্তে লুকানো ইঁদুর মাথা তুলবে এই রাতে।
দুজনে নিশাচর
জ্বলজ্বলে চোখ শিকার ধরার অপেক্ষায়।
রাত বয়ে চলে নিজের নিয়মে…
হেলে পড়ে ধীরে সুবহে সাদিকে!
অনুপল—১৫৮ : বটগাছ
বটগাছের নিচে দাঁড়ালে টের পাই
অতিকায় বটবৃক্ষ কতটা উদাসীন
বটফল ঠুকরে খাওয়া পাখির ব্যাপারে!
আমার তখন ঈশ্বরের কথা খুব মনে পড়ে।
অনুপল—১৫৯ : ভূষণ্ডির কাক—১
নিজেকে আজকাল ভূষণ্ডির কাক মনে হয়
ইলেকট্রিক তারে বসে অস্থির ডানা ঝাপটাই।
ভোরের ভৈরো এলোমেলো কাকের পাখসাটে।
অনুপল—১৬০ : দ্বিত্ব—১ : ঠোকর
কাঠঠোকরা গাছ ঠোকরায়
পোকার আশায়।
‘নেই’ ও ‘আছি’র দ্বিত্বে চিৎকাত
গণিতের অধ্যাপক, ঠোকরায় কিতাব
উত্তর পাওয়ার আশায়।
অনুপল—১৬১ : দ্বিত্ব—২ : নিশিজাগরণ
কবি কিশওয়ার অপেক্ষায়
গায়েবি দিদার নামবে রাতে।
বিড়ালটি জেগে আছে
গর্তে লুকানো ইঁদুর মাথা তুলবে এই রাতে।
দুজনে নিশাচর
জ্বলজ্বলে চোখ শিকার ধরার অপেক্ষায়।
রাত বয়ে চলে নিজের নিয়মে…
হেলে পড়ে ধীরে সুবহে সাদিকে!
অনুপল—১৬২ : ওম শান্তি
শিরিষ গাছের ডালে ভূষণ্ডির কাক
সারারাত অস্থির ডানা ঝাপটেছে।
আমজাদ আলী খানের সরোদ
ভৈরবির কোমল নিষাদে ঘা দিতে ভুল করেনি,
পাখিটি তবু মুখ থুবড়ে পড়েছে রাস্তায়।
‘ওম শান্তি’ বলে আমি ওর পাশে বসে পড়ি,
হাঁ-করা ঠোঁট দুটি বুজিয়ে দিতে।
সুদূর মক্কায় হযরত বিলাল বিলাবল ঠাটে
আযান দিতে শুরু করেন, আমি ঠোঁট মিলাই:
‘নিদ্রা হইতে জাগরণ উত্তম’
—কথাটি আওরাই বারবার…
আরেকটি মানুষজন্ম পাওয়ার দুরাশায়।
আমজাদ আলী খানের কোমল নিষাদ যদিও মন্দীভূত হয়েছে,
বেলালের বিলাবল ঠাটে আযান বিলীন ভোরের অবসানে!
… … …

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বছরে জন্মগ্রহণ করেন। লেখালেখির শুরু নব্বইয়ের দশকে, ছোটকাগজকে কেন্দ্র করে। ছোটকাগজ ও ব্লগ—এই দুই মাধ্যমেই তিনি নিজের স্বর নির্মাণ করেছেন। প্রকাশনায় খুব সক্রিয় না থাকলেও গান শোনা, সিনেমা দেখা ও পাঠের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ক্রমাগত প্রস্তুত রেখেছেন নতুন লেখার সম্ভাবনার জন্য। অনেকগুলি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি থাকলেও তাঁর একটি মাত্র বই প্রকাশিত হয়েছে—বৃহৎ আখ্যাননির্ভর উপন্যাস “উল্টোরথের মানুষ”।
মূলত প্রবন্ধ তাঁর প্রিয় ক্ষেত্র হলেও কবিতা, গল্প ও আখ্যানের ভেতরেও তিনি বারবার ফিরে গেছেন। বিষয়বৈচিত্র্যের চেয়ে তাঁর লেখার প্রধান শক্তি হলো—একটি অনুসন্ধানী মন, যা মানুষের অস্তিত্বগত প্রশ্ন থেকে শুরু করে পরিবেশ, প্রাণীজগৎ ও জীবনের বহুমাত্রিক স্তরগুলোর দিকে অবিরাম অগ্রসর হয়। তাঁর লেখায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের চাপ নেই; বরং থাকে প্রশ্নের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক ধীর, গভীর ও আত্মমগ্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রমণ। তাঁর এই চিন্তার পরিসর স্থানিক সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বমানবিক অভিজ্ঞতা ও দার্শনিক অন্বেষণের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। এই অনুসন্ধিৎসা তাঁকে আমাদের সময়ের এক নীরব কিন্তু তীক্ষ্ণ বুদ্ধিজীবী কণ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করে।
আজীবন ছোটকাগজে লিখে যাওয়া মিনহাজ মূলত এক অন্তর্মুখী সাধনার ভেতর দিয়ে তাঁর লেখাকে নির্মাণ করেছেন। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, সংগীত ও চিত্রকলার প্রতি সমানভাবে আগ্রহী—এই বহুমাত্রিক মনন তাঁর ভাবনাকে দিয়েছে একটি স্বতন্ত্র ও আন্তঃশাস্ত্রীয় বিস্তার। তিনি কেবল বিষয় স্পর্শ করেন না, বরং বিষয়গুলোর মধ্যে সঞ্চরণ করেন—একটি থেকে অন্যটিতে, অভিজ্ঞতা থেকে চিন্তায়, আর চিন্তা থেকে আবার জীবনের বাস্তবতায় ফিরে আসেন।
একসময় তিনি নিয়মিত লিখেছেন গানপার ও রাশপ্রিন্ট ওয়েবজিনে। সিলেট থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজ সূনৃত-এর বেশ কয়েকটি সংখ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী ছিলেন তিনি। বর্তমানে থার্ড লেন স্পেসের (https://thirdlanespace.com/) অন্যতম অবধায়ক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন, যেখানে তাঁর চিন্তা ও লেখালেখি নতুন পাঠকমহলে পৌঁছাচ্ছে। নিবিষ্টতা, নীরবতা এবং দীর্ঘ মননশীল প্রস্তুতির ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর এই লেখকসত্তা—সময়ের ভিড়ে আলাদা করে চিনে নেওয়ার মতো এক স্বতন্ত্র উপস্থিতি।
