বিজয়ের লিপিকা
আমার হাতে বেয়নেটসহ থ্রি নট থ্রি রাইফেল,
তোমার কন্ঠে একটি ফুলকে বাঁচানোর গান।
আমার পদতলে ধর্ষকের ছিন্নমস্তক দেহ,
তোমার সবুজ শাড়িতে লোহিত কনিকার আলপনা!
আমি উর্বর পলিমাটি ফুরে ওঠা সবুজ ঘাস,
তুমি অশ্রুসিক্ত তাজা রক্তজবার স্খলিত পাপড়ি।
আমার দেহজুড়ে বৃষ্টিস্নাত সোঁদা মাটির ঘ্রাণ,
তোমার হৃদয়ে আটপৌরে পুরোনো মাটির কুটির।
আমার হাতে সোনালি আঁশের আর্দ্র গন্ধ,
তোমার হাতে গামছা বাঁধা এক গামলা পান্তাভাত।
আমি বিজয় স্মরণিতে শৃঙ্খলিত কুচকাওয়াজ,
তুমি সমুজ্জ্বল সকালে ৩১ বার তোপধ্বনি।
আমি জাতীয় স্মৃতিসৌধে দন্ডায়মান উন্নতশির,
তুমি বিজয়স্তম্ভে চর্যাপদ হরফে আঁকা এপিটাফ।
আনন্দ–দিন
উল্লাসে হাসে দীপ্ত কিরণ,
বাঁকা চাঁদ সহচরে জেগে থাকা রাত, আর
আলোকিত গৃহে গৃহে উৎসারিত ফোটনকণার ছোটাছুটি।
খুশির জোয়ারে ভেসে যায় দিন
পরিচ্ছন মুসাফাতে মনমহুয়ারা ঘোরে,
আহরণে আলিঙ্গনের উষ্ণতা আস্বাদন।
চারিদিকে নতুনের বীণ, জীবনের পরিচ্ছদ,
রঙের চাকচিক্য ছড়ানোর উৎসব।
প্রাণবন্ত প্রাণের মিলনমেলার চালচিত্র,
টুকরো টুকরো পৃথিবীর আনন্দ হালচাল,
প্রাণের পরশে মনের দর্পণ বিহ্বল সারাদিন।
বিধাতার কৃপাবারি ভাসে বাতাসে, যেন
নুরের তাজাল্লি-বিধৌত মনুষ্য প্রতিভাস।
ঈদগাহে যেন আন্দোলিত হয়-
পরমানন্দের মহা সমাবেশে।
হৃদয়চিত্তে জ্বলে ওঠে মহব্বতের দীপিকা।
অসহ্য অবক্ষয়
তোমার বক্ষে ক্রমাগত অত্যাচারে
আমার কবিতার চিত্রকল্পে—
দাউ দাউ আগুন জ্বলে!
তোমার অঙ্গে ক্রমাগত জখমে
ছিন্নভিন্ন ত্বকের যন্ত্রণায়—
আমার কবিতা চিৎকার করে কাঁদে!
তোমার স্নায়ুতে পাশবিক আঘাতে
মস্তিস্কের প্রদাহের পীড়নে—
আমার কবিতার শব্দগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যায়!
তোমার রক্তে সায়ানাইডের ধীর-দূষণে
শহীদ মিনারের লাল সূর্য আজ ধীরবৎ কালচে!
তোমার ভূতলে অশুভ দানবের পদাঘাতে
সবুজ শ্যামলিমা আজ ধূসরাভ লালচে!
লক্ষ শহীদের রক্ত বিধৌত জমিন
এখনো রক্ত স্নানে জর্জরিত!
নৈতিকতার নিম্নমূখী স্মারক সূচক
ভূ-ত্বক ভেদ করে এখন গুরুমণ্ডলে অন্তর্ভেদী!
আমার আর সহ্য হয় না তোমার অবক্ষয়!
আমার আত্মা সহস্র তীরের আঘাতে অনবরত ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে!
আমার হৃদয় এক বিশালাকার হাতুরির অনবরত আঘাতে মুহুর্মুহু ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
আমার চোখের পানি তোমার সোনালি সকাল ফেরত আনবে না জানি!
তবুও তোমাকে শর্তহীন ভালোবাসি—
হে প্রিয়তি, আমার জন্মভূমি!
এখনো তোমার শাশ্বত আকাশ আমাকে স্বাগত জানায় অবারিত শ্যামল প্রান্তরে।
এখনো তোমার আলোতে উদ্ভাসিত হই-
প্রতিটি সূর্যদয়ের স্নিগ্ধ ভোরে।
এখনো তোমার অণুঅঙ্গের রন্ধ্রে রন্ধ্রে
স্বাধীনতার ঘ্রাণ খুঁজে ফিরি আমৃত্যু।
স্বপ্নভঙ্গের পরেও স্বপ্নালু মন আমার—
নিদ্রাভঙের স্বপ্নবিভায় অস্থির অপেক্ষমাণ।
স্মৃতির সিন্দুক
তুমি তো সেদিন দেশ হতে চেয়েছিলে,
তোমাকে দেখেছি তাই স্বচ্ছ প্রতিবিম্বে—
লাল সবুজের এক মোহনীয় ভুমি।
স্মৃতির সিন্দুকে রাখা স্বপ্নীল আবেশ
মুঠো মুঠো তুলে এনে রাখি ক্যানভাসে
রুপালি তটিনী আর সবুজ শ্যামলে।
তুমি তো আমার সেই আটপৌরে দেশ,
বৈভবের প্রাচুর্যতা ম্লান হয়ে যায়—
যখনই দেখি তোমার স্নিগ্ধ উর্বরতা।
চন্দনের ঘ্রাণ নয়, সোঁদা জল মোহে—
ভেসে চলি সাথে ওড়া ছাতিমের রেণু,
আলোকিত দুপুরের রোদ মেখে গায়ে।
ষড়ঋতু রংমাখা রংহীন গালিচায়
শত রংমাখা দেহ সে আমার প্রেমিকা,
অণু অণু অনুভূতি পুষে রাখা বুকে।
কচি কলাপাতা রঙে বধুবেশে তুমি,
সোনারঙা পাটক্ষেত সে ঐশ্বর্য প্রতুল,
ধান-শালিকের ওই সোনালি অঁচল।
সুপারির বনবীথি প্রশান্তির নীড়,
এক কুঁড়ি দুটি পাতা পাহাড়ের গানে,
আলটপকা বৃষ্টির জলে অবারিত মাঠ।
যত দূরে থাকি তবু স্মৃতি অমলিন,
থেকে থেকে হৃদয়ের আকুল আকুতি,
সোনাফলা প্রান্তরের ভালোবাসা লীন।
মুক্ত মাটির নীড়
মা গো একটা শার্ট কিনেছি পরবো ঈদের দিন,
লাল-সবুজের আল্পনাতে বাজবে প্রাণের বীণ।
ওরা যদি আসতে না দেয় তোমার কোলে আজ—
জেনো আমি রক্ত দিয়েই পরবো বীরের সাজ।
শার্টটি পরে ঘুরতে যাবো তোমায় নিয়ে মা গো,
মাটির কানে বলবো ডেকে, বীর বাঙালি জাগো।
হয়তো ওরা করবে গুলি তোমার ছেলের বুকে,
তবু আমি থামবো না মা, দেবো জালিম রুখে।
রক্তে লেখা শপথ মা গো মাটির অধিকার,
নরপশুর বিরুদ্ধে তাই যুদ্ধ স্বধিকার।
শপথ নিলাম জহরমুক্ত করবো তোমার কোল—
সেই কোলেতে শুয়েই আমি পড়বো শান্তিবোল।
দোয়েল-কোয়েল মুক্তকণ্ঠে গাইবে মধুর সুরে,
শাপলাবিলে কাটবো সাঁতার তোমার শান্তিপুরে।
যমুনাস্রোত চলবে ধেয়ে বঙ্গসাগর প্রেমে,
সোনালি আঁশ, পালের নৌকো আঁকবো সবুজ ফ্রেমে।
মাটির কসম করবো বিনাশ পীড়নকরের ঘাঁটি,
মুক্ত করবো তোমার কোলের প্রতি ইঞ্চি মাটি।
ভেবো না মা আমি যদি না আসি আর ফিরে—
রক্তে রাঙা শার্টটি আমার উড়বে মুক্ত নীড়ে।
. . .

জন্ম ও বেড়েওঠা ঢাকায়। মতিঝিল এজিবি কলোনির ছায়াঘেরা পরিবেশে কাটিয়েছেন শৈশব-কৈশোর, জন্ম : একুশে ফেব্রুয়ারী
ছোটবেলায় কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশে পিতা- কবি আফজাল উদ্দিন শিকদারের কবিতা পাঠের মাধ্যমে কাব্যজগতে পদার্পণ।
মা: মমতাজ বেগম, ২০১৫ সালে বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষ্যে “রত্নগর্ভা মা” উপাধিতে ভূষিত হন।
স্বপরিবারে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন এবং “আই টি ইঞ্জিনিয়ার” হিসেবে রিনিউয়েবল এনার্জি সেক্টর, নিউ ইয়র্ক-এ কর্মরত আছেন। পেশায় টেকনোলজিষ্ট হলেও সুমন শামসুদ্দিন-এর নেশা কাব্যচর্চা।
সুমন শামসুদ্দিন কবিতা লিখেন, তার চারখানা প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ:
১) হৃদয়মূলক ঋণ (২০২২)
২) বনমাতালের পথে (২০২৩)
৩) মহুয়াফুলের দিন (২০২৪)
৪) ইশারার মৌমাছিরা (২০২৫)
ভালোবাসেন প্রকৃতিসঙ্গ, ভ্রমণ ও বই পড়তে।
