Thursday, March 26, 2026
Homeসবিশেষগদ্যছোটকাগজে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আলোকরেখা । নাহিদা আশরাফী

ছোটকাগজে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আলোকরেখা । নাহিদা আশরাফী

৫২ এর ভাষা আন্দোলন ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পট পরিবর্তন এমন ভূমিকা রাখে যে তা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নব সংস্করণ উম্মোচন করে আমাদের সামনে। ৭১ পরবর্তী ছোট কাগজে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন বা পর্যালোচনায় যাবার আগে খুব ছোট করে হলেও আমাদের ৭১ পূর্ববর্তী কিছু পত্রিকা নিয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন মনে করছি। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ মূলত একই সংস্কৃতির ধারক  ও বাহক হবার পরও মেধা ও মননশীলতার বিকাশশীল মনোভাবের কারণে পূর্ব বাংলাকে গুরুত্বের সাথে না নিয়ে উপায় থাকে না। তখন ঢাকার বাবুবাজারের ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ থেকে  কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’,  বর্তমান ঝালকাঠির মাগুরা গ্রাম নিবাসী ঈশ্বর চন্দ কর কর্তৃক সম্পাদিত  দু’ ফর্মার পাক্ষিক ‘বরিশাল বার্তাবহ’, আবুল হোসেন সম্পাদিত  ‘শিখা’, বগুড়া থেকে প্রকাশিত এম মেছের আলী সম্পাদিত দ্বিমাসিক ‘তরুণ’, চট্টগ্রাম থেকে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ ও আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর সম্পাদনায় মাসিক ‘সাধনা’, কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে মীর মশাররফ হোসেন এর প্রকাশনায় ও সম্পাদনায় পাক্ষিক ‘হিতকরী’ ও কুমারখালী গ্রাম থেকে ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’,  যশোরের পালুয়া-মাগুড়া গ্রাম থেকে বসন্তকুমার ঘোষ ও তার ভাই শিশিরকুমার ঘোষ প্রকাশিত পাক্ষিক পত্রিকা ‘অমৃত প্রবাহিনী’ , মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার গিরিশচন্দ্র রায় চৌধুরীর ‘বিজ্ঞাপনী যন্ত্র’, রাজশাহীর বোয়ালিয়া ধর্মসভা থেকে প্রকাশিত ‘হিন্দুরঞ্জিকা’, বিক্রমপুরের লোনসিংহ গ্রাম থেকে নারী বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা ‘অবলাবান্ধব’, ঢাকার ব্রাক্ষ্মসমাজের সংগঠন সঙ্গত সভার মুখপাত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় পাক্ষিক ‘বঙ্গ-বন্ধু’ যার সম্পাদক ছিলেন বঙ্গচন্দ্র রায়। আমি এই পত্রিকাগুলোর কথা উল্লেখের একটাই কারন। লক্ষ্য করলে দেখবেন আমি যেসব পত্রিকার কথা এখানে উল্লেখ করলাম তার মধ্যে দু একটি বাদে বাকি সব পত্রিকাই পূর্ববংগের  বিভিন্ন জেলা ,তৎকালীন মহকুমা অথবা প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল থেকে । আর এ দ্বারা খুব সুস্পষ্ট ভাবেই আমরা বুঝতে পারি যে এই সব পত্রিকাই পরবর্তীতে আমাদের ছোট কাগজে মনোনিবেশে বিশেষ সহযোগিতা করেছে।

মূলত পুঁজিবাদী সভ্যতার একটা নির্মম আর নিষ্ঠুর চেহারা রয়েছে। তার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট কাগজের নিত্যযুদ্ধ। ছোট কাগজ সঙ্কটে ও সম্ভাবনায় কতটা পিঠ সোজা রেখে , নৈতিকতা বিসর্জন না দিয়ে চলতে পারে তা ভাবার সময় পেরিয়ে গেছে। এ কথার মানে এমন নয় যে লিটল ম্যাগের বৈশিষ্ট্য বা এর সক্ষমতা-অক্ষমতা নিয়ে নতুন কিছু বলবার নেই। তবে তার টিকে থাকার প্রাণান্তকর লড়াই যে সকল যুগেই ছিলো, আছে এবং থাকবে এবং তাকে এই অগ্নিপরীক্ষায় সর্বকালেই উত্তীর্ণ হতে হবে তা নিয়ে দ্বিমত করবার অবকাশ নেই বোধকরি। এখানে লেখক শহীদ ইকবালের লেখা বাংলাদেশের লিটলম্যাগঃ রচনাদর্শ ও গতিপ্রকৃতি প্রবন্ধের কিছু অংশ তুলে ধরলেই আমাদের ছোটকাগজের একটা রূপরেখা চোখের সামনে ফুটে ওঠে – “বাংলাদেশের লিটলম্যাগ অনেকাংশে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করেছে। নতুন সাহিত্য সৃষ্টির উৎসমুখ রচনা করেছে। নবতর লেখক ও প্রজন্মকে দিয়েছে যথোচিত দিকনির্দেশনা। লিটলম্যাগ বেশিরভাগই হয়তো দীর্ঘস্থায়ী নয়, কিন্তু কমিটমেন্টে ও ভয়হীন সাহসে যে ব্যক্তিত্বের জন্ম দেয় – শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে যে চেতনবীজ রোপণ করে – তা দূরপ্রসারী।  আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় কী কিংবা ভাষার আন্তরশক্তির বীজ কোথায় লুক্কায়িত – এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিয়েছে লিটলম্যাগ। প্রান্তিক-কৃষ্টির চর্চা, দ্বান্দ্বিক জীবনধারার সত্যানুসন্ধান প্রকৃত লিটলম্যাগের কাজ।“

সাহিত্যের সৃজনশীলতাকে দ্বিধাহীন চিত্তে গ্রহণ, নব চিন্তা ও চেতনায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সঞ্চার, ব্যক্তি ও সামগ্রিক মূল্যবোধের মূল্যায়ন, তারুণ্যের চিৎকারকে স্বাগত জানানো, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও শোষণের রিরুদ্ধশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থানকে পরিস্কার উপস্থাপনই ছোট কাগজকে আলাদা করে অন্য সব কিছু থেকে ৷ সংঘাতে ও সংগ্রামে লিটল ম্যাগকে সাহিত্যের অস্ত্রাগার বলেই ভাবি আমি।

১৯৭১ সাল। আমাদের চেতনায়, আমাদের মর্যাদায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সন। পৃথিবীর বুকে এক নতুন মানচিত্র, ভূখণ্ড আর পতাকার জন্মের সন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনের সাথে সাথে তার শিল্প সাহিত্যেও এলো নবজাগরণের ঢেউ। সাময়িক পত্রিকার সময়টা পার করে আমাদের ছোট কাগজগুলো হয়ে উঠলো এক একটি বারুদ ভরা সত্যিকারের লিটল ম্যাগ ৷ সাময়িকীর সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আর সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ছোট কাগজগুলো যেন নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে এগিয়ে আসে । ষাটের দশক এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা একে একে পাই সপ্তক, কন্ঠস্বর,স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক, প্রতিধ্বনি, বক্তব্য, যুগপৎ, স্যাড, সমকাল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক সাহিত্যের যে চর্চা ও চেতনা তা কী  স্বাধীনতার পরেও অব্যাহত থেকেছে ? নাকি  আমাদের বোধে ,মননে, সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলনে চেতনাজগতে্র বিপুল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে , যা সাহিত্যে অনেকাংশেই  প্রভাব ফেলেছিল ।

স্বাধীনতা লাভের পরপরই চট্টগ্রাম থেকে কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় বলে জানা যায়।  ১৯৭২ সালের ২১শে ফ্রেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় সুদীপ দেওয়ানজী সম্পাদিত একুশের সংকলন ‘শেষ থেকে শুরু’। ১৯৭২ সালে আরো দুইটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। শাহ আলম পিন্টু সম্পাদিত ‘যুগান্তর’ এবং সুবীব মাহমুদ সম্পাদিত ‘উদভাস’। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় কবি শিশির দত্ত সম্পাদিত ‘সম্পাদক’। প্রায় কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত হয় আনন্দ মোহন রক্ষিত সম্পাদিত ‘শোনিত গালিচা পাতা জনপদ’। চট্টগ্রাম লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক কবি কমলেশ দাশগুপ্ত উপরোক্ত তথ্য নিশ্চিত করেছেন বলে জানা যায় জাহেদুল আলম লিখিত প্রবন্ধ ‘ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন ‘হাজারী লেইন’ ‘ থেকে । সত্তর আশির দশকে এসে আমরা পাই বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পত্রিকা যেমন- পূর্বমেঘ, বিপ্রতীপ, জনান্তিক, গান্ডিব, লিরিক, তৃণমূল, পেঁচা, প্রাপ্ত, চালচিত্র সহ বেশ কিছু ছোট কাগজ । এই প্রতিকুল পরিবেশ ও সঙ্কটাপন্ন অস্থির পরিস্থিতিতেও কিছুসংখ্যক লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় যা সত্তরের দশকের সাহিত্যচর্চাকে অব্যাহত রাখে। ১৯৭২ সনে ওবায়দুল ইসলাম ও মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ সম্পাদিত  স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন মুখপত্র , মফিদুল হক সম্পাদিত গণসাহিত্য  সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকাশিত  কিছু ছোটকাগজ মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ ও সময়কালের উপরে নানাভাবে আলোকপাতের চেষ্টা জারি রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে কাজ করেছে এমন কিছু ছোটকাগজের সম্পাদকগণের সাথে  কথা বলার চেষ্টা করেছি আমি । যদিও অল্প সময়ে সবার অবধি পৌঁছুতে পারিনি। তবে যতটুকু তাদের সম্পর্কে জেনেছি তার কিছুটা ধারণা দেবার প্রয়াসে নিচে কয়েকটি  ছোটকাগজের কাজ তুলে ধরা হল। এর বাইরেও অনেক কাজ রয়েছে যা ভবিষ্যতে লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছা রইলো।

দ্রষ্টব্য-
কামরুল হুদা পথিকের সম্পাদনায় ছোট কাগজের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে কাজ করেছে এমন বেশ কিছু কাগজের মধ্যে দ্রষ্টব্যের নাম উল্লেখযোগ্য। বেশ কিছু সংখ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ নামে একটি পর্ব সংযুক্ত হতো। যে গল্পে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হায়েনাদের অত্যাচারের ভয়াবহতা, বিভৎসতা, নারকীয়তা যেমন ভাবে ফুটে উঠেছে, তেমনি ফুটে উঠেছে একদল নির্ভীক বাঙালির আত্মদানের মহান ইতিহাস। অন্ন, বস্ত্র বা অস্ত্র কোন কিছুই ছিলো না অথচ বুক ভরা সাহস নিয়ে দেশ মাতৃকার জন্যে লড়াইয়ে নেমে পড়া সেইসব বীর বাঙ্গালিদের কথা। দ্রষ্টব্যের অষ্টম সংখ্যায় লেখা আছে- “আজকের দিনেও আছে তেভাগা আন্দোলনের দাবানলে বুকে লালন করা কানসাট কি ফুলবাড়িয়ার বীর কৃষকদের হার না মানা লড়াকু অভ্যুত্থান… আজকের দিনেও আছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জানবাজি রাখা লাগাতার যুদ্ধ। আজকের দিনেও আছে জলপাইরঙ্গা রাষ্ট্র যন্ত্রের উদ্যত ফনা মটকে দেয়া ছাত্র শিক্ষকদের নির্ভীক লড়াই, আজকের দিনেও আছে জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ রুখে দেবার এক নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম। আজকের দিনেও আছে দৃষ্টব্য, অনিন্দ্য, চালচিত্র, শিরদাঁড়া, প্রতিশিল্প, দুয়েন্দে, কফিন, টেক্সট এবং খানখান প্রস্তুতিরত আরো অনেক আনাগত যোদ্ধা ও যুদ্ধের আলামত”।

চালচিত্র–
রাজা শহিদুল আসলাম সম্পাদিত ছোট কাগজ চালচিত্র যেখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানামুখী কজের সন্ধান পাই।

১- সংগ্রাম, বিদ্রোহ আন্দোলন নিয়ে একটি প্রবন্ধ সংখ্যা করে যেখানে প্রায় এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রবন্ধ স্থান পায়।
২-১৯৭১- তৃণমূলের জনযোদ্ধা এই শিরোনামে দুই তিনটি সংখ্যা করে চালচিত্র।
৩- মুক্তিযুদ্ধ ও প্রবচন – নামে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাও তারা করেন যেখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উত্তরাঞ্চলের নানান আঞ্চলিক কথা, উপকথা, গল্প, গান, স্লোগান স্থান পায়৷
৪- এমনকি স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নামে একটি সংখ্যা করেন যেখানে নানান পেশাজীবি, বলতে গেলে দিনমজুর, রিক্সাচালক থেকে উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ নানান পেশার মানুষের বক্তব্য তুলে ধরা হয় যারা মূলত লেখক নন।

তবে চালচিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি পূর্নাঙ্গ উপন্যাস প্রকাশ করা। সম্ভবত ছোট কাগজগুলোর মধ্যে চালচিত্রই প্রথম যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উপন্যাস প্রকাশ করেন। উপন্যাসটি ছিলো সৈয়দ রিয়াজুর রশিদের। উপন্যাসটির নাম ছিলো ‘শ্রাবণ হয়ে এলে ফিরে’। যদিও পরবর্তীতে ২০২০ সালে এই নাম পরিবর্তন করে উপন্যাসের নাম রাখা হয় ‘ইতি তোমার মুজিব’ এবং এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

অনিন্দ্য-
একাত্তরের শহীদদের কান্নাধ্বনি যেন আজও আমাদের কানে বাজে। মেশিনগান, মর্টার শেল আর ট্যাঙ্কের মুহুর্মুহু রক্ত হীম করা শব্দ, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালির উপর যে নৃশংস ভয়াবহতা নামিয়ে এনেছিলো আজও তা আমাদের অন্তরাত্মায় আতংকের কাপন তোলে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল লিটল ম্যাগাজিন ‘অনিন্দ্য’। হাবিব ওয়াহিদের সম্পাদনায় একাত্তরের সেই ‘কালরাত্রি’ নিয়ে যে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি তাতে বর্নিত হয়েছে সেই রাতের নির্মমতা ও নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র। বিশ্বের ইতিহাসে এমন জঘন্য বর্বরতার জন্ম দেয়া এই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার পিলখানা, রাজারবাগ ও আরো ১১ টি পয়েন্টে সেনা মোতায়ন করে এবং অগণিত অসহায় সাধারণ মানুষকে হত্যার পরে ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বারে গিয়ে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজুবর রহমানকে গ্রেফতার করে।

কালরাত্রি নিয়ে বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনগুলোর মধ্যে এই প্রথম এ ধরনের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ হলো। অনিন্দ্যর কালরাত্রির একটি সংখ্যা উৎসর্গ করা হয়েছে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যাকে যারা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন সেসব শ্রদ্ধেয় গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি। সাদাকালোয় দারুণ সব চিত্রকর্ম, অলঙ্করণ, কালরাত্রি নিয়ে কবিতা গদ্য গল্পে সাজানো হয়েছে সংখ্যাটি। ২৫ শে মার্চ নিয়ে অনিন্দ্য মোট চারটি সংখ্যা করে। এবং প্রতিটি সংখ্যা উন্মুক্ত করা হত ঠিক রাত ১২টায় যখন পাকিস্থানি হানাদার বাহিনি তাদের হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিলো। অনিন্দ্য ৮৪/৮৫ এর দিকে শুরু হয়ে এ অবধি চলেছে। এছাড়া ‘শুধু মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ নামে একটি সংখ্যাও অনিন্দ্য প্রকাশ করে। ছোট কাগজ মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে শুধু যে সাহিত্যেই বন্দী থাকেনি তার প্রমান মেলে দুটি কাজের মাধ্যমে।

১। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চিত্রকর্ম (নবীন ও প্রবীণ মিলিয়ে) নিয়ে সংখ্যা করা।
২। আরেকটি কাজ যেটি লিটল ম্যাগ এর ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে সেটি হল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনিন্দ্য থেকেই একটি ডকুমেন্টারি করেন যার নাম ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল ৭১’। আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে ৫/১০ টি শয্যা নিয়ে যে হাসপাতালটি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা ও চিকিৎসার জন্যে সেই হাসপাতাল কে কেন্দ্র করে ডকুমেন্টরিটা তৈরী করা হয় । যেখানে কাজ করেছেন মেয়র আখতার, ডা জাফড় উল্লাহ চোধুরী , নিয়াজ মোর্শেদ , নার্স হিসেবে ছিলেন খুকু আপা , রেশমা আপা , আসমা আপা , সুলতানা কামাল আপা , পাণ্ণা আপা সহ আরো অনেকে বিখ্যাত ব্যাক্তিবর্গ। ব্রাদার হিসেবে ছিলেন- মান্নান ভাই যিনি নার্সদের ট্রেনিং দিতেন কী করে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধদের  প্রকৃতভাবে সেবা দেয়া যায় । তিনি তাঁর ডকুমেন্টারিতে সেই বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন এবং সৌভাগ্যবসত এই মহান ব্যাক্তিবর্গের অনেকেই তাঁর ডকুমেন্টারিতে কাজ করেছেন ।

আরো ডকুমেন্টারি করার ইচ্ছে আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান এদেশে নিরক্ষর জনগোষ্ঠী থেকে বুদ্ধিজীবী , কিশোর থেকে তরুণ, আমাদের মা-বোন যেভাবে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের মধ্য থেকে মাঝিদের নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি করার ইচ্ছে আছে।

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক  কয়েকটি ছোটকাগজ যারা মূলত কাজ করতো মুক্তিযুদ্ধ ও এর পরবর্তী সময়কার কর্মসূচি ও পুনর্গঠনের বিষয় বস্তু নিয়ে তার মধ্যে অনিক ইসলাম সম্পাদিত প্রজন্ম, প্রবীর সিকদার সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ত্রৈমাসিক উত্তরাধিকার ৭১ সহ আরো বেশ কিছু ছোট কাগজ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। উত্তরাধিকার ৭১ এ প্রথম সংখ্যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধের ভয়াবহতা ও তীব্রতা ভয়ংকরভাবে ফুটে উঠেছে। এই সংখ্যায় মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন তার নিজ অভিজ্ঞতা, কোন বোন লিখেছেন তার ভাইকে হারানোর অনুভূতি। বীরাঙ্গনা বয়ানে তুলে ধরেছেন তাদের উপরে চলা অত্যাচার বিভিষিকার নির্মম স্মৃতি, ক্যাম্পে গণহত্যার বর্ণনা।

৭৫ এর ১৫ ই আগষ্ট আমাদের জীবনে আরেকটি কালো অধ্যায় সূচিত হল। আমরা যেন পেয়েও হারালাম আমাদের স্বাধীনতার স্বাদ। হাজারো বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে প্রায় ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে দাঁড়াবার, ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখছিলো যখন সদ্য স্বাধীন দেশটি তখনই এলো চরমতম আঘাত। সপরিবারে হত্যা করা হল বাংলাদেশের রূপকার, স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবর রহমানকে। এ আঘাত শুধু রাজনৈতিক পট পরিবর্তন করলো এমন নয় শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপরেও নেমে এলো ঘোর অমানিশা। আমাদের কবি সাহিত্যিক, সমপাদকরা দ্বিধান্বিত  হয়ে পড়লেন। নান মত নানা পথ,পথের অন্তরালে চোরাগলি, সীমাহীন আঁধার। এই বিবশকালে দিকভ্রান্তির নাগরদোলায় দুলতে থাকলো লেখক ও শিল্পীসমাজ। রাজনীতির উর্ধে কেউ নয়। এই সত্য ক্রূর হাসি হেসে সামনে এসে দাঁড়াল। স্বাধীনতার উৎসমূল ভুলে গেল কতক লেখক আর কতককে বাধ্য করা হল ভুলে যেতে নয়তো চুপ থাকতে। বন্ধ হল কলমের স্বাধীনতা।

প্রশ্ন হল এর পরে আমাদের ছোটকাগজে মুক্তিযুদ্ধ ও তার সামগ্রিক অবস্থার যে বিস্তৃত পটভূমি তা কতটা উঠে এসেছে । এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনে দেয়া অধ্যাপক যতীন সরকারের  এক  সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ তুলে ধরা হল যার মাধ্যমে আমার বক্তব্য পরিস্কার হবে এবং সমর্থনও মিলবে বলে বিশ্বাস করি। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন কবি  শিশির রাজন।

শিশির রাজন : মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের যে সাহিত্য, সেখানে কি মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা প্রকাশ ঘটেছিল বা গতিশীল হয়েছিল? আপনার বিশ্লেষণ কী?

যতীন সরকার : আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে গতিশীল হয়নি, তা নয়। কিন্তু যে পরিমাণে গতিশীল হওয়ার প্রয়োজন ছিল সে পরিমাণটি হয়ে ওঠেনি। কিছু কিছু সাহিত্যিক অবশ্যই আছেন (নাম বলতে চাই না, কেউ থাকবে, কেউ বাদ যাবে তা বিব্রতকর) যাঁরা বেরিয়ে এসেছেন কিন্তু সার্বিকভাবে আমাদের সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তনটা হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি।

শিশির রাজন : সেটার ক্ষেত্রে মূল বাঁধাটা কী ছিলো?

যতীন সরকার : আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, সেটাকে যেভাবে বিস্তৃত করার উচিত ছিলো, তা আমি আগেই বলেছি সে সাংস্কিৃতিক ধারাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নতুন যে সাহিত্যিকরা এসেছিলেন তারা প্রকৃত প্রস্তাবে ঐ মুক্তিযুদ্ধের চৈতন্যে উদ্বুদ্ধ হওয়ার অবস্থায় ছিল না। এ অবস্থাটা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে আমরা পাকিস্তানের ভূতের কবলে নিমজ্জমান হয়েছিলাম। তা থেকে নতুন সাহিত্যিকরা খুব কম ক্ষেত্রেই বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।

শিশির রাজন : তার মানে হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাকিস্তানের ভূত সব মিলিয়ে সেই সময়ে আমাদের সাহিত্যিকদের এক ধরনের দ্বিধা ছিলো?

যতীন সরকার : হে, ঠিকই বলেছ তুমি।‘

কিন্তু আমরা তো জানি যেখানেই বাঁধা সেখানেই ছোটকাগজ বাঁধা পেরুনোর সংকল্পে অটুট । অতএব সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়েও কিছু আলোর পাখি গাইলেন ভোরের প্রতীক্ষা সংগীত । ৭৫ এর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সাহস করে কাজ করেছেন আবু মুসা চৌধুরীর স্পর্শ। মিনার মনসুরের এপিটাফ, আবদুল্লাহ আবু সৈয়দ এর কণ্ঠস্বর।

শেষ করবো হাজারী লেইন এর কথা বলে।

“১৯৭১। পাক-বাহিনীর ক্রুর ছোবলে আক্রান্ত হলো এ শহর। জ্বললো আগুন। অত্যাচার। আর চললো গুলি। ৮ এপ্রিল। নৃশংস হত্যার এক পৈশাচিক প্রতিযোগিতা। এই ক্রুর পৈশাচিকতার শিকার হলো এ হাজারী লেইন। ভাঙলো দুর্জয় জনতার প্রতিরোধ। কিন্তু ভাঙেনি দৃঢ় প্রত্যয় আর প্রতিজ্ঞা। শহীদের তাজা খুনে ভাসলো এই লেইন। শান্তিপ্রিয় মানুষের সুখের নীড়ে আগুন। হাজারী লেইন হলো ভস্মিভূত। ওরা সবাই জানতো ধ্বংস-নিশ্চিহ্ন; কিন্তু সৃষ্টি? সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞায় মাতৃভূমে বিজয়ের রক্তিম পতাকা উড়ালো। আজ ৭৪। স্মরণ করি হৃদয়ের অকুন্ঠ শ্রদ্ধায়, সুচিন্তিত প্রতিজ্ঞায় ঐ দিন এবং শহীদের মুখাবয়বগুলো।”

কাজল কান্তি দে সম্পাদিত ‘হাজারী লেইন ৭১-৭৪’ লিটল ম্যাগাজিনের উদ্বোধনী সংখ্যার সম্পাদকীয়ের অংশ বিশেষ তুলে ধরলাম মাত্র । এটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে । তিনি আরো জানান যে হাজারী লেইন থেকেই তিনি  মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন । যুদ্ধ শেষে দৈনিক ‘দেশবাংলা’ পত্রিকায় যোগদান করেন। … মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বের, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়কার হাজারী লেইনের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে তিনি একটি প্রকাশনা করার তাগিদ অনুভব করেন । সেই অনুপ্রেরণায় ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশ করেন  ‘হাজারী লেইন’।

দীপক জ্যোতি আইচ এর এক আর্টিকেল  ছিলো ‘হাজারী লেইনের ইতিকথা’ শিরোনামে। সেই আর্টিকেল থেকে জানা যায় – “১৯৭১ এর ১লা মার্চের পর হাজারী লেইনের সবাই অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে হাজারী লেইনে আবুল ফজল, গুরুপদ দে ও ফয়েজুর রহমান হাজারী লেইন সংগ্রাম কমিটির যথাক্রমে সভাপতি, সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে পরিচালিত করেন। বিনোদা ভবন ছিলো সংগ্রামের নির্দেশ কেন্দ্র। এই হাজারী লেইনকে কয়েকবার করে পুড়ে দেয়। ৮ই এপ্রিল চরমভাবে আগুন জ্বেলে ভস্মিভূত করে হাজারী লেইনকে। টুন্টু সেন-পিতা বিপিন চন্দ্র সেন, রনজিত কুমার দাশ- পিতা রবীন্দ্র দাশ, নবদ্বীপ বনিক, কুঞ্জহরি ধর ব্যক্তিরা এই লেইনের অন্যতম শহীদ।”

হাজারী লেইন এর উল্লেখ করে শেষ করতে চাওয়ার  একটাই কারণ ।  যেই হাজারী লেইনকে পুড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানী হানাদারেরা উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো সেই হাজারী লেইনই আবার ফিনিক্স পাখির মত স্বাধীন ভূখণ্ডে ডানা মেলেছিলো । এ যেন সত্যিকারের ছোটকাগজের  বৈশিষ্ট , দ্রোহে, বিপ্লবে বা আন্দোলনে যাকে দমিয়ে রাখা যায় না কোন কিছুতেই । ছোটকাগজ যেন সেই কবিতার মত, ‘আমি  জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি।‘

সাহিত্যের সৃজনশীলতাকে দ্বিধাহীন চিত্তে গ্রহণ, নব চিন্তা ও চেতনায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সঞ্চার, ব্যক্তি ও সামগ্রিক মূল্যবোধের মূল্যায়ন, তারুণ্যের চিৎকারকে স্বাগত জানানো, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও শোষণের রিরুদ্ধশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থানকে পরিস্কার উপস্থাপনই ছোট কাগজকে আলাদা করে অন্য সব কিছু থেকে ৷ সংঘাতে ও সংগ্রামে লিটল ম্যাগকে সাহিত্যের অস্ত্রাগার বলেই ভাবি আমি। জন্মেই যে সুতীব্র চিৎকারে জানান দেয় আজন্মের ক্রোধ , শিশুকাল অতিক্রম করতে করতেই যে ঘোষণা দেয় নবতর জীবনবোধের, কৈশোরে যে প্রতিবাদী আর দুর্দান্ত আঠেরোয় যে বুর্জোয়া মানসিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মোহ আর মাৎসর্যের থোড়াই কেয়ার করে সত্য ও সৃজনের গান গায়। যাকে ক্রফোর ‘প্ল্যানড ভায়োলেন্স’ এর সাথে তুলনা করা চলে। চর্বচূষ্যপেয় কর্পোরেট বা ভোগবাদী পত্রিকা যখন তালিয়া বাজানো লেখক তৈরি করে লিটল ম্যাগ সেখানে সাহস, সময় ও স্বাতন্ত্র্য তৈরি করে। আবদুল মান্না সৈয়দ এর মত করেই বলতে হয়, ‘ লিটল ম্যাগাজিন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একটি ব্যাক্তিগত সুঁড়িপথ’। এই সুঁড়িপথ দিয়েই স্বরচিত সুরের আলো ও স্বরের গাম্ভীর্য চোখে পড়ে। আর বারুদ ভরা লিটল ম্যাগের এসবই প্রধানতম বৈশিষ্ট্য  বলে মনে করি। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই আলো-অন্ধকার আরো প্রাঞ্জল হয়ে উঠুক আমাদের ছোটকাগজে; এটাই প্রত্যাশা।

. . .

এইরকম আরও পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
ad place