Wednesday, March 25, 2026
Homeসবিশেষগল্পসিঙ্গেল মাদার । দিনা ফেরদৌস

সিঙ্গেল মাদার । দিনা ফেরদৌস

সেদিন এক ফেসবুক বন্ধুর পোস্টে কমেন্ট করতে গিয়ে তোর সন্ধান পাই।একটি কমেন্টে চোখ পড়তেই মনে হলো কমেন্টদাতা আমার না বলা কথা বলে দিয়েছেন। তাই পোস্টে কমেন্ট না করে কৌতূহলে তোর প্রোফাইলে উঁকি দিতেই মনে হলো চেনা চেনা লাগছে!

এক ঝটকায় পিছনে ফিরে গেলাম। আরে এতো আমাদের স্কুলের সেই ডানপিটে মেয়েটা!

যাকে দেখলে এক সময় প্রচণ্ড রাগ হতো।
পেছনের বেঞ্চিতে বসে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাক্ষণ কী এতো ফুসুরফাসুর’রে বাবা—

একদিনও ঠিকমতো হোমওয়ার্ক নেই। ক্লাসে টিচার পড়া ধরালেই শাস্তি ছিল যার অবধারিত, এই সেই মেয়ে!

বার্ষিক পরীক্ষায় যার রেজাল্ট ছিল বিশেষ বিবেচনায় পাস।

ফেসবুকে তোর ছবি দেখে সেদিন চমকে উঠি। অনেক বদলে গিয়েছিস।
আজকাল বুঝি মেকআপ করিস খুউব?

নাকি এআই সুন্দরী, হুম? জাস্ট কিডিং…
সত্যিই তুই অনেক সুন্দরী হয়ে গিয়েছিস। কী সুন্দর চকচক করছে তোর স্কিন।

বর বুঝি খুব আদর করে তোকে? তোর বরের সাথে লেপ্টালেপ্টি করা কয়েকটা ছবি দেখে কিছুটা ঈর্ষা হয়েছিল,নাকি এমন ছবি মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয় বলে নিজেকে বুঝিয়েছিলাম ঠিক মনে নেই।বেশ ভালোই আছিস তাহলে স্বামী-সংসার নিয়ে।অথচ দেখ, তোর থেকে ঢের বেশি ভালো থাকার কথা ছিল আমার।
স্কুলে কোনদিন দশের বাইরে নাম্বার ছিল না।
হোমওয়ার্ক, ক্লাসের পড়া কোথাও ত্রুটি ছিল না কোনদিন।

স্কুলের সেইসব দিনের কথা মনে আছে তোর?
ছুটির পর স্কুলের বাইরে ছেলেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো মেয়েদের অপেক্ষায়।কত ছেলে তাকিয়ে থাকত আমার দিকে। আমাকে রেখে তোদের তখন পাত্তা দেয় কে।
জানিস, এই অহংকার আমার আত্মবিশ্বাসে রূপ নিয়েছিল এক সময়।
মনে হতো যেদিকেই তাকাই, সব আমার ।

 

আমি ভয়ের পূর্বাভাস পাই।
আমি একা। একেবারেই একা। আমি ভালো নেই। আমার মন ভালো নেই।
আমার শরীর ভালো নেই। আমার কিছুই ভালোলাগে না।গোপন কথা হলো, এইসব আমি কাউকে বলতে পারি না। এসব বলতে নেই। বললে দুর্বল ভাবে লোকে।

যেই পুরুষই আমার দিকে তাকাবে, ইচ্ছেমত নাকে দরি দিয়ে তাকে ঘুরাতে পারবো।পেয়েও গিয়েছিলাম নাকে দরি দিয়ে ঘুরাতে পারা এক পুরুষ, যে আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না।পরিবারের অনিচ্ছাতে একদিন সব ছেড়ে ছুড়ে তার কাছে চলে যাই।কী আনন্দে তার সাথে কেটে গিয়েছিল ছয়টা বছর কিছুই টের পাইনি। পড়াশোনাটাও শেষ করি।এরমধ্যে আমাদের কোল জোড়ে আসে আমাদের ফুটফুটে একটি পরী।যার দিকে তাকালে মনে হতো পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য বুঝি এখানেই-

তখন মনে মনে কত জনের সাথে নিজেকে তুলনা করতাম। আমি সবার থেকে ভালো আছি।আমার সুন্দর বর, সুন্দর ঘর, সুন্দর যা কিছু সব আমার। কেউ আমার মতো সুখী না।সংসারে কীভাবে সুখী হতে হয়, কীভাবে বরের মন পেতে হয়,
এইসবের উপর বড় বড় লেকচারও দিতাম। বিশ্বাস কর, একটুও বাড়িয়ে বলছি না।নিজেকে এক প্রজাপতির মতো মনে হতো। তখন আমার অনেক বন্ধু ছিল।

সাপ্তাহবারে আমরা আড্ডা দিতাম, দলবেঁধে বেড়াতে যেতাম, গিফট আদানপ্রদান হতো, আরও কত কী…তুই কোনদিন আমার বন্ধু ছিলি না। তোকে বন্ধু ভাবার কোন কারণও ছিল না।তোর সব বন্ধুরা ছিল তোর মতো বিশেষ বিবেচনায় পাস করা অকর্মা।

সেদিন ফেসবুকে তোর ছবি দেখে পড়লাম তোর লেখা কিছু ।পড়তে পড়তে মনে হলো কীভাবে তুই এতো বুঝিস?
ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল।ক্লাসের শেষ বেঞ্চিতে বসা শ্যামলা মেয়েটি কীভাবে আমার স্বপ্নের জীবন পেয়ে গিয়েছে,
খুব জানতে ইচ্ছে করে। একটু বলবি, কি করে আমার স্বপ্নের জীবনে তুই বসবাস করিস?

আজ অনেকদিন হয় আমার সংসার নেই।
পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়ে এক কাপড়ে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল।সেই বিরাট ইতিহাস আর না বলি। শোনার সময় তোর হবে না, বুঝি।
তুই নাকি বেশ ভালো লেখালেখি করিস?

সেদিন ফেসবুকে তোকে দেখে, তোর লেখা পড়ে কিছুটা আশ্চর্য হয়েই তোর খোঁজ করেছিলাম।
জানতে পারলাম তুই নাকি আইন পাসও দিয়েছিস? থাকিস দেশের বাইরে?

কি রে, কী করে তোদের এত কিছু হয়?
যাদেরকে দেখে এক সময় ভাবতাম, খুব বেশি হলে, লন্ডনে গিয়ে সিল্কের শাড়ি পরে, পাঁচটা বাচ্চা সামলিয়ে,
লাউ দিয়ে বোয়ালমাছ রান্নার গল্প দেবে। তাদের মধ্যে তোর মতো কিছু বলদকে আরও নিচে দেখতাম।

লন্ডনে যেতে হলে অন্তত গায়ের রঙ ফর্সা হতে হয়। তুই নাকি থাকিস আমেরিকাতে?
যাইহোক, তবুও তোকে বলি। কাউকে আমার কথাগুলো বলতে খুব ইচ্ছে করে।
কত কথা জমে বুকের ভেতর। কতকিছু বুঝি, বলা হয় না কিছুই। অথবা বলতে নেই।

আমি একজন সিঙ্গেল মাদার।এই কথাটি বলার মধ্যে যতটা শক্তি আমি পাই, তারচেয়ে বেশি কষ্ট পাই নিজেকে বুঝাতে গিয়ে
যে আমারও একটা সংসার থাকতে পারত। নিজের ঘর, নিজের রুম, নিজের বিছানা থাকতে পারত।
বিছানায় নিজের মানুষ থাকতে পারত। ইচ্ছেমত যার বুঝে যখন তখন ঝাঁপিতে পড়া যেত।মাঝে মাঝে মাঝরাতে পায়ে কোন কাঁথা বালিশ কিছু লাগলে কেঁপে উঠি।
আধো ঘুমে-জাগরণে মনে হয় কেউ আমার পাশেই আছে। যার উপর পা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়।আমার পাশে এখন সপ্তাহবারে আড্ডা দেয়া সেই বন্ধুদের কেউ নেই। অনেকেই এখন এড়িয়ে চলে আমায়।

তোর খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলাম, তুই নাকি বিশাল নারীবাদী হয়েছিস? কথা বলিস পুরুষদের বিরুদ্ধে সব সময়?

তবে শোন, এই যে আমি সিঙ্গেল মাদার কথাটা শুনে নারীরাই আমার দিকে আড়চোখে বেশি তাকায়।আমার সাপ্তাহবারে আড্ডা দেয়া, দাওয়াত খেতে যাওয়া সেই বন্ধুরা, এখন আমাকে দেখলে-রীতিমতো তাদের বরকে লুকিয়ে রাখে। আমার আশেপাশেও তাদের আসতে বাড়ন।এদিকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট পাই আমি সেই পুরুষদের থেকেই।

মনে হয়, দুনিয়ার সব পুরুষ আমার দুঃখটা ঠিক বুঝে।সবাই নিজের বউয়ের আড়ালে আমাকে সাহায্য করতে চায়, রাতবিরেতে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয়।

জানিস, এই জগৎ-সংসারে পুরুষদের দুঃখও কম না। ঘরে নিজের বউ যখন বুঝে না বর কী চায় –
এর থেকে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে। পুরুষদের ওতো একটা চাহিদা আছে।
আজ-কালকার পড়াশোনা জানা মেয়েগুলাও বড্ড সেকেলে হয়। তারা বুঝে শুধু বরের টাকা ।

সেই টাকা কিভাবে একজন পুরুষকে ম্যানেজ করতে হয় সেটা নিয়ে না ভেবে; ঘরে বর ঢুকতেই তারা দেখে শুধু বরের ভচকানো চেহারাটা। নিজেরটা ছাড়া এই মেয়েগুলা দুনিয়ার আর কিছুই বুঝে না। এদের না আছে জ্ঞান, না আছে রূপ, না আছে বুদ্ধি, সুযোগ পেলেই বরের সাথে ঝগড়া করে। তবুও দেখ- পুরুষরা ওইসব বউদের নিয়েই বাধ্য হয়ে সংসার করে। মানিয়ে চলার চেষ্টা করে। একটাও বানিয়ে বলছি না। এইসব গল্প পুরুষদের কাছ থেকে শুনা।  দুই-একজন বললে, বুঝতাম বানিয়ে বলছে। বেশিরভাগের মুখ থেকেই একি কথাগুলো শুনেছি।

কষ্টটা হলো এরপরও এই অযোগ্য মেয়েরাই সংসার করে। এতো যোগ্যতা থাকার পরও আমার সংসার করা হলো না।

বহু চেষ্টা করেও সংসারে সুখী হতে পারিনি। সংসারটা ধরে রাখতে পারিনি আমি।
আমার বরও শুনেছি বাইরে আমার নামে এইসব কথা বলে বেড়াত। কেনো যে এইসব মিথ্যা বলত, জানি না।আর কোন পুরুষ’ত এমন বলে না। সবাই আমার রূপের, গুণের, জ্ঞানের প্রশংসা করে।কতজন বলেছে, আমি চাইলেই বউ ছেড়ে আমার দায়িত্ব নেবে বাচ্চাসহ।সুন্দরী হওয়ার এই এক সুবিধা, সবাই সুবিধা দিতে চায়।

একটা এনজিওতে জব করি। সেখানেও পুরুষ কলিগরা আমাকে সব সময় সহযোগিতা করতে চায়।আর নারীরা করে পিছনে বদনাম। জানিস, সব পুরুষ আমার দুঃখ বুঝে, বুঝে না শুধু নারীরা।

কোথাও নতুন পরিচিত হওয়ার পর যখনই বলি আমি সিঙ্গেল মাদার-
পুরুষরা শুনেই বলে, খুব ভালো করেছেন, ভুল জায়গা থেকে বের হয়ে এসে।
এখন নিজের মতো বাঁচুন। আগ বাড়িয়ে নিজের ফোন নাম্বারটা দিয়ে বলে,
যখন প্রয়োজন ফোন দিবেন। আপনার পাশে আছি সব সময়।
কী যে ভরসা পাই। অল্প পরিচয়ে মানুষ কত সহজে আপন হয়।

দুনিয়ার পুরুষেরা কত বুঝে আমাকে, বুঝে আমার স্ট্রাগল, বুঝে না শুধু কাছের মানুষেরা।একদিন বৃষ্টির রাতে মেয়েটির প্রচণ্ড জ্বর আসে।
বড় ভাই, মেঝভাইকে কত ডাকলাম। তারা বলল, কিছুই হবে না। সকালে দেখা যাবে।ফোন দিলাম সেইসব পুরুষদের, যারা সব সময় আমার পাশে আছে বলেছিল।
কেউ ফোন বন্ধ করে দিল। ফোন ধরল না কেউ কেউ।

কেউ ফোন ধরেই কিছু না শুনে, ধমকের সুরে বলল– আপনার কি কমনসেন্স নেই?
মেয়েটার এই অবস্থায় আমার কমনসেন্স থাকে কী করে বল?
এই লোকেরাই একসময় কত গল্প করেছে। সময় চেয়েছে আমার কাছে।সময় দিতে না পারায় সরে গিয়েছে, বুঝি।

বহু পরে বুঝেছি, আমার দুঃখ আসলে কেউ বোঝেনি, কারো বুঝার দরকারও ছিল না।দরকার ছিল আমার, আমার শরীরের। এইসব উদার প্রশংসা ছিল কথার ফাঁদ।

এরপর থেকে যখনই কোন পুরুষকে দেখেছি আমার দুঃখ-কষ্ট-স্ট্রাগল মুখ দেখেই বুঝে ফেলতে পারে,
আমি তাদের থেকে হাজার মাইল দূরে থাকার চেষ্টা করি।
কেউ যদি বলে- একা আছো, ভালোই আছো, আমি বুঝি এটা কীসের ইংগিত।কোন পুরুষ যদি আমার সামনে সিঙ্গেল মাদারের গুণকীর্তন করে, লজিক্যাল কথা-বার্তা বলে

আমি ভয়ের পূর্বাভাস পাই।
আমি একা। একেবারেই একা। আমি ভালো নেই। আমার মন ভালো নেই।
আমার শরীর ভালো নেই। আমার কিছুই ভালোলাগে না।গোপন কথা হলো, এইসব আমি কাউকে বলতে পারি না। এসব বলতে নেই। বললে দুর্বল ভাবে লোকে।

ভাবে আমি ভেঙে পড়েছি। আরও ভেঙে দেবার পাঁয়তারায় থাকে।
খুব শীঘ্রই আমেরিকা আসছি, একা। তোর সাথে দেখা করার ইচ্ছে আছে।কী আসতে পারবো তো তোর বাসায়? বাইরে অন্য কোথাও হলেও সমস্যা নেই।

সরাসরি দেখা হলে, তোকে কিছু বলার আছে আমার। দেখা করেই চলে যাবো।
প্রোফাইল দেখে আমাকে চিনেছিস নিশ্চয়ই ?

ভালো থাকিস।

দিনা ফেরদৌস
দিনা ফেরদৌস
লেখালেখি করেন নারীদের অধিকার, নারীর সংকট এবং নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য নিয়ে। তার লেখালেখির মূল ক্ষেত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ, বিভিন্ন সাময়িকী, নিউজ পোর্টাল এবং প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা। সমসাময়িক বিষয়ের উপর কলাম ও ছোটগল্প লেখা দিনার অন্যতম প্রিয় লেখার বিষয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সক্রিয় দিনার ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে রয়েছে ছবি আঁকা, বই পড়া, আবৃত্তি করা। পড়াশোনা হচ্ছে আইন বিষয়ে স্নাতক। বাড়ি সিলেটে।
এইরকম আরও পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
ad place