[প্রথাগত গল্প আমাদের একটি দৃশ্যমান জগতে নিয়ে যায়, যেখানে ঘটনাগুলো ক্রমান্বয়ে এগোয় এবং আমাদের আবেগকে স্পর্শ করে। কিন্তু এমন কিছু গল্পও আছে, যেখানে দৃশ্যমান ঘটনা প্রায় অনুপস্থিত; সেখানে গল্প এগোয় না—বরং গভীর হয়। এই ধরনের গল্পে প্লটের বদলে কাজ করে একটি ভাবনা, একটি প্রশ্ন, একটি নীরব উপলব্ধি। টেড চিয়াং-এর “The Great Silence” সেই বিরল ধরনের গল্প—যেখানে কাহিনির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতরে জমে থাকা এক ধরনের মানবিক অন্ধত্ব।
টেড চিয়াং এমন এক লেখক, যিনি খুব বেশি লেখেননি, কিন্তু তাঁর অল্প কিছু লেখাই পাঠকমহলে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ও কল্পনা আলাদা দুই জগৎ নয়—বরং একই অনুসন্ধানের দুই দিক। ১৯৬৭ সালে নিউ ইয়র্কে জন্ম নেওয়া এই লেখকের পারিবারিক শিকড় তাইওয়ানে; চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লব-পরবর্তী অভিবাসী পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন প্রকৌশল অধ্যাপক, মা গ্রন্থাগারিক—জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এই পরিবেশেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি গড়ে ওঠে। শৈশব থেকেই বিজ্ঞান ও কল্পনার প্রতি আকর্ষণ ছিল; একসময় পদার্থবিদ হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। তবুও, তাঁর কাছে বিজ্ঞান কখনোই কেবল তথ্য বা প্রযুক্তি ছিল না—বরং এক ধরনের দার্শনিক অনুসন্ধানের উপায় হয়ে উঠেছিল।
চিয়াং-এর সাহিত্যজীবন শুরুই হয়েছিল একরকম হঠাৎ করে—“Tower of Babylon” প্রকাশিত হওয়ার পরই তিনি নেবুলা পুরস্কার পান। এরপর তাঁর প্রতিটি গল্প ধীরে ধীরে সমালোচকদের নজরে আসে। তাঁর দুটি গল্পসংকলন—Stories of Your Life and Others এবং Exhalation—আধুনিক ছোটগল্পে একটি আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। “Story of Your Life” থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র Arrival তাঁকে আরও বিস্তৃত পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।
টেড চিয়াং-এর লেখার আসল শক্তি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে। তিনি নিজেই বলেছেন—বিজ্ঞান কল্পকাহিনি তাঁকে আকর্ষণ করে এই কারণে যে, এর মাধ্যমে দার্শনিক প্রশ্নগুলোকে গল্পে রূপ দেওয়া যায়। অর্থাৎ, তাঁর কাছে গল্প মানে শুধু কাহিনি নয়; গল্প মানে চিন্তার একটি রূপ—একটি জায়গা, যেখানে মানব অভিজ্ঞতার সীমা পরীক্ষা করা যায়।
এই জায়গাটাতেই তিনি আলাদা। তাঁর গল্পে বিস্ময় আছে, কিন্তু তা চমক সৃষ্টির জন্য নয়; বরং চিন্তার দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। সময়, ভাষা, চেতনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এইসব জটিল বিষয় তিনি এমনভাবে গল্পে রূপ দেন, যেন পাঠক শুধু পড়ে না, ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করে। তাঁর ভাষা সংযত, প্রায় নির্মোহ—কিন্তু সেই সংযমের ভেতরেই এক ধরনের আকর্ষণ কাজ করে, যা পাঠককে গল্পের ভেতরে ধরে রাখে।
চিয়াং প্রচলিত বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কাঠামো ব্যবহার করেন, কিন্তু সেটিকে নিজের মতো করে বদলে নেন। তাঁর গল্পে প্রযুক্তি থাকে, কিন্তু প্রযুক্তি কখনোই শেষ কথা নয়; বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের আত্মপরিচয়, নৈতিকতা এবং সম্পর্ক নিয়ে ভাবার একটি উপায়। এই কারণেই তাঁর গল্পগুলোকে একসঙ্গে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি এবং দার্শনিক গদ্য—দুটোই বলা যায়।
বর্তমান সময়েও তিনি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে লিখছেন, বিশেষত The New Yorker-এ। তাঁর লেখা শুধু কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। ২০২৩ সালে তাঁকে টাইম ম্যাগাজিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়—যা দেখায়, তাঁর চিন্তা সাহিত্যিকের পাশাপাশি বৌদ্ধিকভাবেও প্রাসঙ্গিক।
“The Great Silence” গল্পটি প্রথমে খুব সরল মনে হয়—একটি তোতা পাখির কণ্ঠে বলা। কিন্তু এই সরলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বিদ্রূপ: মানুষ মহাবিশ্বের দূরতম প্রান্তে বুদ্ধিমান প্রাণের খোঁজে সংকেত পাঠাচ্ছে, অথচ নিজের পাশেই থাকা এক বুদ্ধিমান, ভাষাসম্পন্ন প্রাণীর দিকে তাকাতে ব্যর্থ। ফার্মি প্যারাডক্সের যে “মহা নীরবতা”—চিয়াং সেটিকে মহাজাগতিক রহস্য হিসেবে না দেখে, মানবিক ব্যর্থতা হিসেবে সামনে আনেন।
গল্পটি আমাদের ধীরে ধীরে একটি প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়—আমরা কি সত্যিই একা? নাকি আমরা এমনভাবে নিজেদের কেন্দ্র করে রেখেছি যে, অন্যের কণ্ঠ আমাদের কাছে পৌঁছায় না? এখানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটা যেন অস্তিত্বেরই এক চিহ্ন: “আমি কথা বলি, তাই আমি আছি।” তোতা আর মানুষের এই মিল আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে। আমরা যে বুদ্ধিমত্তার খোঁজে এত দূর পর্যন্ত তাকিয়ে আছি, সেটি হয়তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে—কিন্তু আমরা সেটিকে দেখতে শিখিনি। আমরা দূরের সংকেত শুনতে চাই, অথচ কাছের কণ্ঠকে এড়িয়ে যাই।
এই গল্পটি আমাদের ধীরে ধীরে এক সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে আসে—যদি সত্যিই সংযোগের ইচ্ছা থাকে, তবে তার শুরুটা হওয়া উচিত সবচেয়ে কাছের জায়গা থেকে। শেষের সেই কথাগুলো—“তুমি ভালো থেকো। আমি তোমাকে ভালোবাসি”—শুধু একটি আবেগ নয়; এটি এক প্রজাতির শেষ সম্ভাব্য সংলাপ, এক নিঃশব্দ আবেদন। এখানে ভালোবাসা আর যোগাযোগ আলাদা থাকে না—একটির ভেতরেই অন্যটি মিশে যায়। তখন মনে হয়, মহাবিশ্বের নীরবতা ভাঙার আগে আমাদের নিজের ভেতরের নীরবতাটাই আগে ভাঙতে হবে।
“The Great Silence”—ফার্মি প্যারাডক্সের এই ধারণার ভেতরেই এক ধরনের দ্বন্দ্ব কাজ করে: আমরা হয়তো একা নই—এটাই স্বাভাবিক মনে হয়; অথচ এত অনুসন্ধানের পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই প্রশ্নের সঙ্গেই চিয়াং আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন যোগ করেন—আমরা কেন আকাশের তারায় বুদ্ধিমত্তার সন্ধানে এত আগ্রহী, অথচ পৃথিবীতেই যে অসংখ্য প্রজাতির মধ্যে সেই বুদ্ধিমত্তা বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, তাদের কণ্ঠস্বরের প্রতি এত বধির? আর কেন আমরা এমন একটি শর্ত তৈরি করেছি, যেখানে কোনো অমানব প্রাণীকে বুদ্ধিমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কেবল তখনই, যখন সে মানুষের ভাষায় আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে—আর তারপর, যখন কিছু প্রাণী সত্যিই তা করতে সক্ষম হয়, তখন আমরা তাদেরই উপেক্ষা করি?
চিয়াং-এর এই সংক্ষিপ্ত গল্পটি, তার মিতব্যয়ী ভাষা ও ঘনত্বের মাধ্যমে, এক ধরনের কাব্যিক প্রভাব তৈরি করে—যেখানে প্রতিটি বাক্য ধীরে ধীরে খুলে যায় এবং পাঠককে একটি বিস্তৃত, কখনো কখনো বেদনাময় চিন্তার ভেতরে নিয়ে যায়। গল্পটি কেবল ভবিষ্যৎ কল্পনার জায়গা নয়; এটি হয়ে ওঠে মানুষকে নতুন করে বোঝার একটি উপায়—বিশেষ করে সেই “অন্য”-কে, যাকে আমরা এতদিন উপেক্ষা করে এসেছি।
এই অর্থে, চিয়াং-এর গল্পে “গভীর নীরবতা” শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বে নয়—বরং আমাদের নিজেদের ভেতরেই নীরবে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
“The Great Silence” গল্পটি ২০১৯ সালে প্রকাশিত Exhalation গ্রন্থ থেকে নেওয়া।

মানুষ অ্যারেসিবো (পুয়ের্তো রিকোর একটি বিশাল রেডিও টেলিস্কোপ) ব্যবহার করে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণের খোঁজে। সংযোগ স্থাপনের এই আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল যে, তারা এমন এক “কান” তৈরি করেছে—যা পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে শুনতে পারে।
কিন্তু আমি আর আমার মতো পাখিরা তো এখানেই আছি। তারা আমাদের কণ্ঠ শোনার প্রতি আগ্রহী নয় কেন?
আমরা এমন এক অমানব প্রজাতি—যারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম। আমরাই কি সেই সত্তা নই—যাকে মানুষ খুঁজে ফিরছে?
- • •
মহাবিশ্ব এত বিশাল যে, বুদ্ধিমান প্রাণ নিশ্চয়ই বহুবার জন্ম নিয়েছে। আবার মহাবিশ্ব এত পুরোনো যে, অন্তত একটি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত প্রজাতির পক্ষে পুরো গ্যালাক্সি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার জন্য যথেষ্ট সময় ছিল। তবুও—পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও জীবনের কোনো চিহ্ন নেই। মানুষ এটাকে বলে—ফার্মি প্যারাডক্স।
এই প্যারাডক্সের একটি ব্যাখ্যা হলো—বুদ্ধিমান প্রজাতিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের অস্তিত্ব গোপন করে রাখে, যাতে কোনো শত্রুভাবাপন্ন শক্তির লক্ষ্যবস্তু না হতে হয়।
আমি, এমন এক প্রজাতির সদস্য হিসেবে—যাদের মানুষ প্রায় বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে—বলতে পারি, এটা সত্যিই বুদ্ধিমানের কাজ।
নীরব থাকা, আর নিজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ না করা—এই কৌশলটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
- • •
ফার্মি প্যারাডক্সকে কখনো কখনো “গভীর নীরবতা”ও বলা হয়। মহাবিশ্ব তো হওয়ার কথা ছিল অসংখ্য কণ্ঠের এক কোলাহল—কিন্তু বাস্তবে তা অস্বস্তিকরভাবে নীরব।
কিছু মানুষ মনে করেন, বুদ্ধিমান প্রজাতিগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার আগেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। যদি তারা ঠিক হয়ে থাকেন—তাহলে রাতের আকাশের এই নীরবতা আসলে এক বিশাল কবরস্থানের নীরবতা।
কয়েক শতাব্দী আগে, আমাদের প্রজাতি এতই বিপুল ছিল যে রিও আবাহো অরণ্য (Rio Abajo forest—পুয়ের্তো রিকোর একটি সংরক্ষিত বন) আমাদের কণ্ঠে মুখর থাকত। এখন আমরা প্রায় হারিয়ে গেছি। শীঘ্রই হয়তো এই অরণ্যও হয়ে উঠবে মহাবিশ্বের বাকি অংশের মতোই নীরব।
-
• •
একটি আফ্রিকান ধূসর তোতা ছিল—নাম অ্যালেক্স। তার বুদ্ধিমত্তার জন্য সে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল—অবশ্য মানুষের মধ্যেই।
আইরিন পেপারবার্গ নামের এক মানব-গবেষক ত্রিশ বছর ধরে অ্যালেক্সকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখেন—অ্যালেক্স শুধু আকার আর রঙের নাম জানত না, সে আসলে “আকার” আর “রঙ” ধারণাটাই বুঝত।
অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতে চাননি—একটা পাখি বিমূর্ত ধারণা বুঝতে পারে। মানুষ নিজেদের অনন্য ভাবতে ভালোবাসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেপারবার্গ তাদের বোঝাতে সক্ষম হন—অ্যালেক্স কেবল শব্দ আওড়াচ্ছে না, সে যা বলছে—তা বুঝেই বলছে।
আমাদের প্রজাতির মধ্যে অ্যালেক্সই ছিল সেই একজন, যে মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি “যোগাযোগের অংশীদার” হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।
অ্যালেক্স হঠাৎ করেই মারা যায়—তখনও সে তুলনামূলকভাবে তরুণ। মৃত্যুর আগের সন্ধ্যায় অ্যালেক্স পেপারবার্গকে বলেছিল—“তুমি ভালো থেকো। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
মানুষ যদি সত্যিই অমানব কোনো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংযোগ খুঁজে থাকে, তাহলে এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা তারা চাইতে পারে?
-
• •
প্রতিটি তোতারই একটি আলাদা ডাক থাকে, যার মাধ্যমে সে নিজেকে পরিচয় করায়। জীববিজ্ঞানীরা একে বলে—তোতার “কনট্যাক্ট কল”।
১৯৭৪ সালে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অ্যারেসিবো ব্যবহার করে মহাকাশে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন—মানব বুদ্ধিমত্তার একটি নিদর্শন হিসেবে। সেটাই ছিল মানবজাতির “কনট্যাক্ট কল”।
বন্য পরিবেশে, তোতারা একে অপরকে নামে ডাকে। একটি পাখি আরেকটির কনট্যাক্ট কল নকল করে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।
যদি কখনো মানুষ অ্যারেসিবোর সেই বার্তাটি পৃথিবীতে ফিরে আসতে শোনে, তাহলে তারা বুঝবে—কেউ তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে।
-
• •
তোতারা ধ্বনি শেখে—আমরা শুনে নতুন শব্দ তৈরি করতে পারি। এটা এমন এক ক্ষমতা, যা খুব কম প্রাণীরই আছে। একটি কুকুর হয়তো অনেক নির্দেশ বুঝতে পারে, কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত শুধু ঘেউ ঘেউ-ই করতে পারে।
মানুষও ধ্বনি শেখে। এই জায়গাটাতেই আমাদের মিল। তাই মানুষ আর তোতার মধ্যে শব্দের সঙ্গে এক বিশেষ সম্পর্ক আছে। আমরা শুধু চিৎকার করি না—আমরা উচ্চারণ করি, আমরা স্পষ্ট করে বলি।
সম্ভবত এ কারণেই মানুষ অ্যারেসিবোকে এভাবে তৈরি করেছে। শোনার যন্ত্রের নিজে থেকে বলার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু অ্যারেসিবো দুটোই—এটি শোনার জন্য একটি কান, আর বলার জন্য একটি মুখ।
-
• •
মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে তোতাদের সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করেছে, কিন্তু খুব সম্প্রতি তারা এই সম্ভাবনাটা ভেবেছে—যে আমরাও বুদ্ধিমান হতে পারি।
তাদের আমি খুব একটা দোষ দিই না। আমরাও একসময় ভাবতাম—মানুষ খুব বুদ্ধিমান নয়। নিজের থেকে এত ভিন্ন আচরণ বোঝা কঠিন।
কিন্তু তোতারা মানুষের সঙ্গে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ—যতটা কোনো ভিনগ্রহের প্রজাতি কখনোই হবে না। আর মানুষ আমাদের খুব কাছ থেকে দেখতে পারে, চোখে চোখ রেখে। তাহলে তারা কীভাবে আশা করে—একটা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমত্তাকে চিনতে পারবে, যদি তারা কেবল শত শত আলোকবর্ষ দূর থেকে আড়ি পেতে শোনার চেষ্টা করে?
-
• •
“aspiration” শব্দটির ভেতরেই যেন এক অদ্ভুত মিল আছে—একদিকে আশা, আর অন্যদিকে শ্বাস নেওয়ার ক্রিয়া।
আমরা যখন কথা বলি, আমাদের ফুসফুসের শ্বাস ব্যবহার করে চিন্তাগুলোকে একটি দৃশ্যমান রূপ দিই। আমাদের তৈরি করা শব্দগুলো একসঙ্গে আমাদের ইচ্ছা এবং আমাদের জীবনশক্তি।
আমি কথা বলি, তাই আমি আছি। তোতা আর মানুষের মতো যারা ধ্বনি শেখে—সম্ভবত তারাই একমাত্র, যারা এই সত্যটিকে পুরোপুরি বুঝতে পারে।
-
• •
মুখ দিয়ে শব্দ গড়ার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। এটা এতটাই আদিম, এতটাই শরীরী—যে মানুষের ইতিহাসজুড়ে তারা এই ক্রিয়াটিকে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর এক পথ বলে ভেবেছে।
পিথাগোরীয় সাধকেরা বিশ্বাস করতেন—স্বরধ্বনিগুলো নক্ষত্রের সঙ্গীতকে ধারণ করে, আর সেই শক্তি আহরণের জন্য তারা সেগুলো উচ্চারণ করতেন।
পেন্টেকোস্টাল খ্রিস্টানরা মনে করেন—যখন তারা অজানা ভাষায় কথা বলেন, তখন তারা স্বর্গের দেবদূতদের ভাষায় কথা বলছেন।
ব্রাহ্মণ হিন্দুরা বিশ্বাস করেন—মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে তারা বাস্তবতার মৌলিক গঠনকেই শক্তিশালী করে তুলছেন।
যে প্রজাতি ধ্বনি শেখে—তারাই তাদের পুরাণে শব্দকে এত গুরুত্ব দিতে পারে। আমরা তোতারাও—এটা বুঝতে পারি।
-
• •
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল একটি শব্দ থেকে—“ওম”। এমন একটি অক্ষর, যার ভেতরে নিহিত আছে যা কিছু ছিল এবং যা কিছু হবে।
যখন অ্যারেসিবো টেলিস্কোপ তার দৃষ্টি তারাদের মাঝের ফাঁকা জায়গায় স্থির করে, তখন সে এক ক্ষীণ গুঞ্জন শুনতে পায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে বলেন—কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড। এটি বিগ ব্যাংয়ের অবশিষ্ট বিকিরণ—যে বিস্ফোরণ প্রায় চৌদ্দ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের জন্ম দিয়েছিল।
কিন্তু এটাকে এভাবেও ভাবা যায়—সেই প্রাথমিক “ওম”-এর এক ক্ষীণ প্রতিধ্বনি হিসেবে। এমন এক অনুরণন, যা এত গভীর ছিল যে মহাবিশ্ব যতদিন থাকবে, রাতের আকাশ ততদিন কেঁপে কেঁপে উঠবে তার তরঙ্গে।
অ্যারেসিবো যখন আর কিছু শোনে না, তখন সে শুনতে পায়—সৃষ্টির কণ্ঠ।
-
• •
আমাদের, পুয়ের্তো রিকোর তোতাদেরও নিজস্ব কিছু পুরাণ আছে। মানুষের পুরাণের মতো জটিল নয়, কিন্তু আমার মনে হয়—মানুষ সেগুলো শুনলে আনন্দ পেত।
দুঃখের বিষয়, আমাদের প্রজাতি বিলুপ্তির পথে—আর তার সঙ্গে আমাদের পুরাণগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আমাদের ভাষা বুঝে উঠতে পারবে—এর আগেই আমরা হয়তো হারিয়ে যাব।
তাই আমাদের বিলুপ্তি মানে শুধু কয়েকটা পাখির হারিয়ে যাওয়া নয়—এর মানে আমাদের ভাষার অন্তর্ধান, আমাদের আচার, আমাদের ঐতিহ্য—সবকিছুর অবসান। এটা আমাদের কণ্ঠের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া।
-
• •
মানুষের কর্মকাণ্ড আমাদের এই প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে—তবুও আমি তাদের দোষ দিই না। তারা এটা ইচ্ছা করে করেনি। তারা কেবল মনোযোগ দেয়নি।
আর মানুষ যে কত সুন্দর পুরাণ তৈরি করতে পারে—তাদের কল্পনা কত বিশাল! হয়তো সে কারণেই তাদের আকাঙ্ক্ষাও এত বিস্তৃত। অ্যারেসিবোর দিকে তাকাও—যে প্রজাতি এমন কিছু নির্মাণ করতে পারে, তার ভেতরে নিশ্চয়ই এক ধরনের মহত্ত্ব আছে।
আমাদের প্রজাতি হয়তো আর বেশি দিন টিকবে না—সম্ভবত আমরা সময়ের আগেই বিলীন হয়ে যাব, যোগ দেব সেই “মহা নীরবতা”-য়। কিন্তু যাওয়ার আগে—আমরা মানুষের উদ্দেশে একটি বার্তা পাঠাচ্ছি। আমরা শুধু আশা করি—অ্যারেসিবোর সেই দূরবীক্ষণ তাদের তা শুনতে সাহায্য করবে।
বার্তাটি হলো—তুমি ভালো থেকো। আমি তোমাকে ভালোবাসি।
থার্ড লেন স্পেস.কম– (https://thirdlanespace.com) এর অন্যতম অবদায়ক মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেট মায়ের কোলে। পেশায় ব্যাংকার।
নিভৃতচারী এই সাগ্নিক লেখালেখিতে অনিয়মিত হলেও পাঠনিবিড় গোড়া থেকেই। বিচিত্র বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ও মনোযোগ, যদিও অধিক ভালোবাসেন সাহিত্য, দর্শন, সিনেমা ও সংগীত। আহমদ সায়েম সম্পাদিত ছোটকাগজ সূনৃত-এর অন্যতম সহযোদ্ধা তিনি।
তারুণ্যের দিনগুলোয় কিছুকাল কাটিয়েছেন সাংবাদিকতায়। ব্যাংকিং পেশার প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও দেশি-বিদেশি ভাবুকদের নিয়ে কথালাপ এবং গদ্য ও অনুবাদে রয়েছে বিশেষ ঝোঁক। থার্ড লেন স্পেস-এ অবদায়ক হিসেবে ইতোমধ্যে বিয়ং-চুল হান, হানা আরেন্ট ও আইজ্যাক আসিমভকে নিয়ে লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী গদ্য ও ভাষান্তর। পারিবারিক জীবনে বিবাহিত ও দুটি কন্যা সন্তানের জনক এই লিখিয়ে ভালোবাসেন বন্ধুসঙ্গ ও আড্ডা। এখনো কোনো বই প্রকাশিত হয়নি, তবে ছোটকাগজে লেখেন মাঝেমধ্যে, যদি মন চায়।
