Thursday, March 26, 2026
Homeসবিশেষগদ্যখোয়াজ মিয়া: শিল্পী ও জীবনবোধ । হোসনে আরা কামালী

খোয়াজ মিয়া: শিল্পী ও জীবনবোধ । হোসনে আরা কামালী

বলতে কোনও দ্বিধা নেই, লোকগানের প্রতি আমার আকর্ষণ জন্মেছে অনেকটা পরিণত বয়সে এসে। বলতে গেলে বড়ো বেলায়ই। যখন আমিকে খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়েছে আমার। যে জীবন পরিভ্রমণ আমাকেই বিবাগি করে তুলেছে, তখন লোককবিদের এক অপাপবিদ্ধ বেদনা, না-পাওয়ার হুতাশন, আর আরাধনার সঙ্গে বলতে কোনও দ্বিধা নেই, লোকগানের প্রতি আমার আকর্ষণ জন্মেছে অনেকটা পরিণত বয়সে এসে। বলতে গেলে বড়ো বেলায়ই। যখন আমিকে খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়েছে আমার। যে জীবন পরিভ্রমণ আমাকেই বিবাগি করে তুলেছে, তখন লোককবিদের এক অপাপবিদ্ধ বেদনা, না-পাওয়ার হুতাশন, আর আরাধনার সঙ্গে নিজের একটা বোঝাপড়া হয়ে যায়। নিজেকে খুঁজে পাই, নির্ভার হতে পারি, তাঁদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারি বেশি। কেন পারি সে বিষয়ের অবতারণা এখানে প্রাসঙ্গিক নয় বটে। তবু একটুকু বলা যায় লোকসংগীতের বিচ্ছেদ-হাহাকার, আর অনিত্য প্রেমের মধ্যে এমন উপাদান থাকে- যা অনেক সময় তত্ত্ব-দর্শন ছাপিয়ে ওঠে। অনিত্য বিষয়ের মধ্যে নিত্যকে আহ্বান করে। সাধারণের মধ্যে জাগিয়ে তোলে অসাধারণ বোধ। যে যেমন পারেন তা থেকে রস আস্বাদন করে নিতে কোনও বাঁধা থাকে না আর। সেখানে একজন কুলবালা আর একজন ভাবুক একই ঐক্যসূত্রে বাঁধা পড়তে পারেন, তাতে কোনও অসুবিধা হয় না।

খোয়াজ মিয়ার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় যা ছিল, অনেকটা না থাকারই মতো। তবে তাঁর সঙ্গে পরিচয় তাঁর গান দিয়ে। কারণ- অনেক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। তাঁকে জানার আগ্রহ কাজ করে তাঁর গান শুনেই। ছোটোবেলা থেকেই গান-ভালোবাসার মোহময় এক জগতে বিচরণ করতাম। তখন রেডিয়ো ছিল গান শোনার একমাত্র মাধ্যম। মামাবাড়ির সৌজন্যে গ্রামোফোনেও গানশোনার স্মৃতি আছে, আজকের শিশুরা যেমন টেকনোলজিতে বড়োদেরকে তুড়ি মারতে পারে, আমাদের সময়টা সেরকম ছিল না। সে সময়, ছোট্ট এক শিশুর জন্য গ্রামোফোন ছিল এক অপার বিস্ময়জাগানিয়া বিষয়। কিন্তু তারপর সেই সময়টিতে আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে রবীন্দ্র-নজরুলেরই গান। প্রথমজীবনে গানে আমার ভালোবাসা ছিলেন কাজী নজরুল। কেন জানি না, বুঝে বা না-বুঝে নজরুলের রাগভিত্তিক গানগুলো কৈশোর থেকেই আমাকে বেশি টানতো। রবীন্দ্রপ্রেম আমার

আরও কিছুদিন পরের ঘটনা। উঠতি যৌবনে, প্রেম-বিরহ বুঝে ওঠার সময়। আজও অবধি রবীন্দ্র-নজরুল আমার সঙ্গেই আছেন। দিনে দিনে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও কত সংগীতজনা। হাল আমলের এডলে, টেইলর সুইফ্টও আমার

শিল্পী খোয়াজ মিয়া বিশ ও একুশ শতক উভয়কেই ধারণ করেছেন তাঁর মনে। তাই তত্ত্ব-দর্শনের বাইরেও তাঁর গানসাধারণ নর-নারীর প্রেম-বেদনা, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি স্বরূপেই তাঁর গানকে জীবন্ত করেছে, মানবীয় করে তুলেছে। সেখানে নেই কোনও রূপকের আবরণ, নেই গূঢ় তত্ত্বের বাহাস। এখানে তিনি একজন প্রেমিক। প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্যই কেবল তাঁর গান। সেখানে তিনি এক চাতক পাখি—

খোয়াজ মিয়া স্মরণপুস্তক। ২৭ একটা বোঝাপড়া হয়ে যায়। নিজেকে খুঁজে পাই, নির্ভার হতে পারি, তাঁদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারি বেশি। কেন পারি সে বিষয়ের অবতারণা এখানে প্রাসঙ্গিক নয় বটে। তবু একটুকু বলা যায় লোকসংগীতের বিচ্ছেদ-হাহাকার, আর অনিত্য প্রেমের মধ্যে এমন উপাদান থাকে- যা অনেক সময় তত্ত্ব-দর্শন ছাপিয়ে ওঠে। অনিত্য বিষয়ের মধ্যে নিত্যকে আহ্বান করে। সাধারণের মধ্যে জাগিয়ে তোলে অসাধারণ বোধ। যে যেমন পারেন তা থেকে রস আস্বাদন করে নিতে কোনও বাঁধা থাকে না আর। সেখানে একজন কুলবালা আর একজন ভাবুক একই ঐক্যসূত্রে বাঁধা পড়তে পারেন, তাতে কোনও অসুবিধা হয় না।

খোয়াজ মিয়ার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় যা ছিল, অনেকটা না থাকারই মতো। তবে তাঁর সঙ্গে পরিচয় তাঁর গান দিয়ে। কারণ- অনেক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। তাঁকে জানার আগ্রহ কাজ করে তাঁর গান শুনেই। ছোটোবেলা থেকেই গান-ভালোবাসার মোহময় এক জগতে বিচরণ করতাম। তখন রেডিয়ো ছিল গান শোনার একমাত্র মাধ্যম। মামাবাড়ির সৌজন্যে গ্রামোফোনেও গানশোনার স্মৃতি আছে, আজকের শিশুরা যেমন টেকনোলজিতে বড়োদেরকে তুড়ি মারতে পারে, আমাদের সময়টা সেরকম ছিল না। সে সময়, ছোট্ট এক শিশুর জন্য গ্রামোফোন ছিল এক অপার বিস্ময়জাগানিয়া বিষয়। কিন্তু তারপর সেই সময়টিতে আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে রবীন্দ্র-নজরুলেরই গান। প্রথমজীবনে গানে আমার ভালোবাসা ছিলেন কাজী নজরুল। কেন জানি না, বুঝে বা না-বুঝে নজরুলের রাগভিত্তিক গানগুলো কৈশোর থেকেই আমাকে বেশি টানতো। রবীন্দ্রপ্রেম আমার

আরও কিছুদিন পরের ঘটনা। উঠতি যৌবনে, প্রেম-বিরহ বুঝে ওঠার সময়। আজও অবধি রবীন্দ্র-নজরুল আমার সঙ্গেই আছেন। দিনে দিনে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও কত সংগীতজনা। হাল আমলের এডলে, টেইলর সুইফ্টও আমার শ্রুতির জগতে তারকা হয়ে উঠেছেন।

পল্লিবাংলার আনাচে-কানাচে অনেক কবি-সাধকের জন্য হয়েছে। তাঁদের জীবন সাধারণ্যের মধ্য থেকে অসাধারণ। কঠিন এক সাধনার পথকে তাঁরা বেছে নেন, অনেকটা অনায়াসেই। এতে তাঁদের যে একাগ্রতা, ধ্যান কাজ করে, যাতে তাঁরা সাধারণ জীবন থেকে ছিটকে পড়েছেন অথবা সরে গেছেন নীরবে। খোয়াজ মিয়াও তার ব্যতিক্রম নন। ছোটোবেলা থেকেই গান টানতো তাঁকে। তাই বেশি দিন স্কুলে যাওয়া তাঁর হয়ে উঠল না। ক্লাস থ্রি পর্যন্তও ছিল পড়াশোনা করার তাঁর ধৈর্যের সীমা।

আমার এসব বিদ্যার দরকার নায়
যে বিদ্যা হয় ঘুসখোর, মদখোর, স্বার্থপর সমাজ ঠকায়।
হইতে চাই না জজ-ব্যারিস্টার, হইতে চাই না উকিল-মুক্তার
হইতে চাই না ডাক্তার মাস্টার, যাই না স্কুল মাদরাসায়।
হিতকর্মে স্বার্থ করা, এসব শাস্ত্রের বিধান নায়।

খোয়াজ মিয়ার ধৈর্য গানে। গানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাঁকে উদ্‌দ্বাস্তু করে দেয়। কিন্তু ঘরে গাইতে পারেন না, বাবা আজিজুর রহমান মৌলবি-মানুষ। গান গাওয়া নিষেধ আছে। তাঁর প্রিয় বাঁশিটিও আপন আলয়ে সুর তুলতে পারতো না। তাই খোয়াজ মিয়ার গান গাওয়ার শুরু পরিবারে বাইরে, পরিচিত পরিমণ্ডলের সীমানা ছাড়িয়ে। গান গাইবার জন্য তাঁকে ঘুরতে হয়েছে দূর-দূরান্তে। সেই সময় থেকেই খোয়াজ মিয়ার বাউল-জীবনের শুরু। গভীর রাত্রে প্রকৃতি যখন ঘুমে কাতর, খোয়াজ মিয়া তখন জেগে থাকেন, গান লেখেন, খুব ভোরে, জগৎ জাগার আগেই শেষ করতে হয় তাঁকে। অনেকটা সংগোপনে চলে তাঁর সাংগীতিক জীবন। তখন ভোরের আজানের সঙ্গে মিশে যেত খোয়াজ মিয়ার বাউলা মনের আর্তি। প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায় এ কবির কোনও আগ্রহ নেই, প্রয়োজনও নেই—

যে বিদ্যায় সুখশান্তি বিরাজে, আনন্দ পায় লোকসমাজে
আমি পড়ি সেই কলেজে কয় অধীন খোয়াজ পাগলায়।

খোয়াজ মিয়ার জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯৪২ সালে। কিন্তু যখন তিনি গান বেঁধেছেন যখন রাজনীতি বদলে গিয়েছে, ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানশাহি রাজসিংহাসনে। খোয়াজ মিয়ার মৃত্যু হয়েছে ২০২৫ সালের ২৬ জুন মাসে, এ হিসেবে খোয়াজ মিয়া দীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন। যদিও লোককবিদের গান-কবিতায় দেশ-চেতনা থাকে অন্যভাবে-বিভাবে। তাঁরা ভাবিত থাকেন বেশি তাদের অন্তর্লোকের আলোকায়নে। খোয়াজ মিয়ার সে সাধনার জন্য দীর্ঘসময় পেয়েছিলেন। সেজন্য তার গানের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়া স্বাভাবিক। অনেকের মতে তিনি পাঁচ হাজারের মতো গানের স্রষ্টা। কিন্তু স্বনামে সংরক্ষিত গানের সংখ্যা সঠিক কত? বলা যায় তাঁর গানের সঠিক সংখ্যা এখনও অমীমাংসিত। সবচেয়ে বেদনার কথা হলো লোকবাংলার সকল প্রায় লোককবিদের বেলায়ও গানের সঠিক সংখ্যা ও সংরক্ষণ বিষয়টি অধিক সত্য হয়ে দাঁড়ায়।

সিলেটের লোকসংগীতের অনন্য আলোকবর্তিকা রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ, হাছন রাজা, আরকুম শাহ, শিতালং শাহ, দুর্বিন শাহ প্রমুখ মহাজনের গান শুনে বড়ো হয়েছেন খোয়াজ মিয়া। এখানে বৃহত্তর সিলেটের লোকবৈশিষ্ট্য মনে রাখা প্রাসঙ্গিক। এ-অঞ্চলে সংগীতধারায় মধ্যযুগ থেকেই শ্রীচৈতন্য ভাবআশ্রিত শক্তিশালী বৈষ্ণবীয় প্রেমধারা এবং সুফিসাধক হজরত শাহজালাল (র.)-এর এবং তাঁর উত্তরসূরি সুফিসাধক ভাবাশ্রিত একটি মরমি ধারা এক মোহনায় মিলিত হয়েছে। যার ফলে এ অঞ্চলের লোকসংগীতে এ দু-ধারারই ভাবচেতনা ভাষারূপ লাভ করেছে মধ্যযুগ থেকেই। খোয়াজ মিয়ার পূর্বসূরিরা এ চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন। খোয়াজ মিয়া তাঁর গানের জীবন মালজোড়া গান দিয়ে শুরু করলেও ধীরে ধীরে তিনি বিচ্ছেদি, দেহতত্ত্ব ও মহাজনি নানা শাখার গানে সাফল্যের সঙ্গে নিজেকে ব্যাপ্ত রেখেছেন। মাত্র বাইশ বছর বয়সে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি সাধক দুর্বিন শাহের টিলায় গিয়ে আস্তানা করেন। দুর্বিন শাহের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। শুরু হয় সিদ্ধি লাভের সাধনা। খোয়াজ মিয়া রপ্ত করতে থাকেন স্রষ্টাকে লাভ করার এবং জাগতিক মোহ থেকে নির্বাণ লাভের নানা সাধনা—

লাগাইয়া পিরিতের ডুরি
আলগা থাইকা টানে রে
আমার বন্ধু মহাজাদু জানে—

এ সাধনা তো বাংলাসাহিত্যের আদি কবিরা তো এমন বোধকেই যার যার মতো ও পথে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। বলছি প্রাচীন কবি চর্যাপদকর্তাদের কথা—

লুই ভণই গুরু পৃচ্ছিঅ জাণ (লুই পাদ)/ বুথের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ (কুক্করী পাদ)/ চীঅ থির করি ধরহরে নাহী/ আন উপায়ে পার ণ জাই। (সরহ পাদ)

প্রভৃতি উদাহরণ প্রাচীন বাংলা গানে আছে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মনে করেন—

আর্যরা ভারতে আসিবার পূর্বে প্রাচীন অনার্য ভারতীয়দের মধ্যে যোগ প্রচলিত ছিল। মহেন-জো-দারো ও হরপ্পার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা হইতে তাহা প্রমাণিত হইয়াছে। এই যোগ প্রথমে আর্যরা গ্রহণ করিয়া ছিলেন। পরে বৌদ্ধ ও জৈনেরা গ্রহণ করেন। এমনকি মুসলমান সুফিসম্প্রদায়ও গ্রহণ করেন। (বাংলা সাহিত্যের কথা, পৃ. ৪১)

খোয়াজ মিয়া বন্ধুর খোঁজ করেছেন তাঁর গানে। বন্ধুর সংগত লাভ করার জন্য এই লোকশিল্পীর যে সাধনা, যে আত্মানুসন্ধান যে চর্চার ভিতর দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন তার শিল্পরূপই খোয়াজ মিয়ার গান। পরমাত্মার লাভের উপায়— সিদ্ধি লাভ। হকিকত, তরিকত-মারিফত সুফিয়ানার এই স্তর পেরিয়েই সিদ্ধি লাভ করা খায়। যারা উত্তীর্ণ হতে পারেন, তারাই সাধক। খোয়াজ মিয়া সাধককবি। তার সাধনা তার গান, জীবনাচরণ এবং পরম পুরুষের সঙ্গে মিলনের জন্য ফানাফিল্লাহ। জাগতিক বন্ধুত্বকে পেরিয়ে ঐশ্বরিক বন্ধুকে লাভ করার চেষ্টাই আরাধ্য—

হুহু হুহু ইয়ায়ু ইয়াহু, আল্লাহ আল্লাহ বল
ফানাফিল্লাহর দেশে মন তুই, যাবা যদি চল।

এ প্রসঙ্গে জালালুদ্দিন রুমীকেও স্মরণ করা যায়— I gazed into my own heart, I saw Him. He was nowhere else. (Coleman Barks)

তাঁকে আবিষ্কারের জন্যই মনের দুঃখে খোয়াজ মিয়ার হাওরের মাঝে গান গাইতে যাওয়া এবং মনের মানুষকে খোঁজা। সিদ্ধি লাভের আশায় গুরুর সন্ধান করা। গুরু ভজার মাধ্যমে চলে সে অনুসন্ধান। তবে খোয়াজ মিয়া একজন আস্তিক মানুষ ছিলেন। যতদূর জানা যায় তিনি নামাজ-কালাম আদায় করতেন নিয়মিত। সাকার মানুষের মাধ্যমেই সকল লীলা ও কর্মসম্পাদন করেন নিরাকার নিরঞ্জনে। অর্থাৎ আকারের কায়ায় রয়ে নিরাকারের অবস্থান। খোয়াজ মিয়ার গানে আছে—

সৃষ্টির স্রষ্টা আছে, শাস্ত্রে বলে গেছে
কেউ নাহি দেখেছে সে কোনজনা ।
সে নিকটে না তফাত, মানব কি দেওজাত
কুহেতুর কাবাত কিংবা শহর মদিনা।

দেহ ও আত্মার সম্পর্ক কী— কেমন? খোয়াজ বলেন- কায়ায় আছে মায়া, মায়ায় আছেন তিনি। তবে সহজে তিনি ধরা দেন না। তাকে লাভ করতে হয় সাধনার মাধ্যমে। মানবদেহের মাঝেই রয়েছে আত্মানুসন্ধানের গোপন তরিকা। পির-ফকির-সুফি সাধকরা এই মাটির দেহের সাধন করতে চেয়েছেন। দেহের মাঝেই মোকাম, মঞ্জিল, চন্দ্র, লতিফা, ইন্দ্রিয়, বুরুজ।

দেহতত্ত্বের বিষয়-আশয় নিয়ে গান বেধেছেন, গেয়েছেন। আত্মানুসন্ধানে নিরলস, খোয়াজ মিয়া গেয়ে ওঠেন—

এই ঘর কে বানাইল রে
সে তো আজব কারিগর
বাহির হইত ঘরের ভেতরে সুন্দর।।

এই দেহের মাঝেই চলে সন্ধান। সাধক খুঁজে বেড়ান সোনার মানুষ, সহজ মানুষ আর তিনি তো পরম পিতারই কায়ারূপ, লালন যেমন বলেন—’এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।’ এই সোনা ফলানোর চেষ্টায়ই মানবধর্ম, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাকুলতা। খোয়াজ মিয়া মানবিক মানুষ। ধর্ম তার অন্তরকে আলোকিত করেছে, মানুষকে ভালোবাসতে সাহায্য করেছে।

খোয়াজ মিয়া গৃহী সাধক ছিলেন। যদিও তাঁর মন বসত না, গানের টানে ছুটে বেড়িয়েছে। গুরু ভজেছেন। কিন্তু সংসার ধর্ম পালন করেছে। সন্তানাদি নিয়ে কষ্ট করেছেন জীবিকার জন্য। আর্থিক অনটনে আজীবন তাঁকে লড়তে হয়েছে। সেই অন্তর্যাতনা থেকে তাঁর গানও হয়ে উঠেছে মানবিক, ব্যক্তির হয়েও নৈর্ব্যক্তিক। এই সমাজের, এই দেশের। স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন কণ্ঠযোদ্ধা তিনি। যেমন- তিনি খোদাভক্তি, মরমিবাদ, সুফিসাধনা দেহতত্ত্বের গানে নিজেকে অনন্যমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার সাধনায় মত্ত ছিলেন ঠিক তেমনই রাধা-কৃষ্ণলীলা বিষয়ক বৈষ্ণবীয় ভাবের সংগীতও তাঁর কণ্ঠে উদাসী হয়ে উঠেছে। যখন খোয়াজ মিয়া পেয়ে ওঠেন—

স্বরূপেরই পর্দায় রাখছো সর্ব অঙ্গ ঢাকি
পর্দা উঠাও স্বরূপ দেখাও ছাড়ো লুকালুকি।

এ তো বৌদ্ধ শূন্যবাদেরই উত্তরপথ—
দেখিতে না পারি যারে তারে বলি শূন্য
তাহারে চিন্তিলে দেখি পুরুষ হয় ধন্য
নাম শূন্য কাম শূন্য শূন্যে যার স্থিতি
সে শূন্যের সঙ্গে করে ফকির পিরিতি।
শূন্যেতে পরম হংস তথা শূন্যে ব্রহ্মজ্ঞান
যথাতে পরম হংস তথা যোগধ্যান।
(জ্ঞান-প্রদীপ)

শিল্পী খোয়াজ মিয়া বিশ ও একুশ শতক উভয়কেই ধারণ করেছেন তাঁর মনে। তাই তত্ত্ব-দর্শনের বাইরেও তাঁর গানসাধারণ নর-নারীর প্রেম-বেদনা, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি স্বরূপেই তাঁর গানকে জীবন্ত করেছে, মানবীয় করে তুলেছে। সেখানে নেই কোনও রূপকের আবরণ, নেই গূঢ় তত্ত্বের বাহাস। এখানে তিনি একজন প্রেমিক। প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্যই কেবল তাঁর গান। সেখানে তিনি এক চাতক পাখি—

বন্ধু আমার নবীনা প্রেমপিরিতি জানে না
আশা দিয়া ভালোবাসা দিল না।।
রসিয়া বন্ধু রঙ্গিচঙ্গি, মন মজাইতে জানে ভঙ্গি
নিদানকালে হয় না সঙ্গী, কারে বলি দেশ ছাড়িয়া।।

গবেষণার একটি বড়ো বিষয় হল বিশেষায়ণ, শ্রেণিকরণ, সাযুজ্য, অভিনবত্ব ইত্যাদি বিষয়ের পূঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। খোয়াজ মিয়াকে বাউল বলা যায় কি না, তিনি প্রথাবদ্ধ দীক্ষিত বাউল কিনা- আমার কাছে খোয়াজ মিয়াকে পাঠ করতে বড়ো বিষয় বলে মনে হয় না। রবিঠাকুরের ‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি, তখন তারে চিনি, আমি, তখন তারে জানি’, খোয়াজ মিয়াকে যখন গানের ভিতর দিয়ে দেখি তখন শিল্পীকেই দেখি, একজন মানুষকেই দেখি। বিবাগি মানুষ, উদাসী মানুষ, বাউলা মনের মানুষ। তিনি গৃহে ছিলেন বটে, কিন্তু গৃহ তাঁর ছিল না। মনে তিনি ছিলেন উদ্বাস্তু। Know Thyself বা আত্মনং বিদ্ধি-নিজেকে চেনো। যে নিজেকে চিনেছে সে আল্লাহকে চিনেছে। সে চেষ্টা করেছেন খোয়াজ মিয়া। তবু তাঁকে আমি গৃহী বাউলই মনে করি। শাহ আবদুল করিমের মতো তিনি, বাংলার বাউল। দুর্বিন শাহের তত্ত্বগানের ভেদ মার্গের একজন অনুসারী এবং সিলেট অঞ্চলের লোকসাংগীতিক ভাবের অনুসারী।

.  .  .

হোসনে আরা কামালী
হোসনে আরা কামালী
কবি - প্রবন্ধিক, পেশা অধ্যাপনা। প্রকাশিত বইগুলোর নাম: ‘নাশপাতি ঘ্রাণে মন(কবিতা), গদ্য লেখার গদ্য(প্রবন্ধ), বন্দনার ঠিক আগে (কবিতা), সুহাসিনী দাস (জীবনী গ্রন্থ), নিকট থাকো বৃক্ষ(প্রকাশিতব্য)
এইরকম আরও পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
ad place