১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে দেশের অপর অঞ্চল—পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় মানুষের অন্তরে যে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তার বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই। শুধু একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা ছিল। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে মাত্র নয় মাসের মধ্যেই পূর্ব বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নিজের স্থান করে নেয়।
নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের মানুষই কোনো না কোনোভাবে অংশগ্রহণ করেছিল; খুব কম পরিবারই ছিল, যাদের জীবন যুদ্ধের স্পর্শমুক্ত ছিল
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাদের নির্মমতার কথা যেমন ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে, তেমনি স্বাধীনতার আহ্বায়ক শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর নামেই গঠিত মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে জীবন বাজি রেখে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাও ইতিহাসে চিরভাস্বর ও চিরঅম্লান হয়ে থাকবে—এটাই ইতিহাসের দাবি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একদল ছিলেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা—যারা তখন ‘বিচ্ছু’ বলেও পরিচিত ছিলেন। তাঁরা অনেকেই মেলাঘর, নির্ভরপুর, পশ্চিম দিনাজপুর এবং দেরাদুন থেকে ট্রেনিং নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরাই আবার যারা ভারতে ট্রেনিং নিতে যেতে পারেননি, তাঁদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
এই ঘটনার পর গেরিলা কর্মীদের পত্রিকা ছাপানোর কাজ বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেল। সেদিনের পর থেকে এই চারজন মুক্তিযোদ্ধার ‘গেরিলা’ পত্রিকা আর কোনোদিন সকালে বাড়ির দরজার নিচে দেখা যায়নি।
ঢাকা শহরের অদূরে, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বর্তমান সাভার উপজেলার শিমুলিয়া এলাকায়, সেক্টর–২-এর আওতায় ঢাকা উত্তর ক্র্যাক প্লাটুন গঠন করা হয়। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় দলের প্রথম কমান্ডার ছিলেন রেজাউল করিম মানিক। তিনি ১৩ নভেম্বর (মতান্তরে ১৪ নভেম্বর) পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর সহকারী কমান্ডার নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু দলের নেতৃত্বে আসেন।
রেজাউল করিম মানিকের অধীনে ঢাকা উত্তরের এই দলের ভেতর থেকে ১১ জনের একটি ‘সিটি টিম’ গঠন করা হয় এবং তাঁদের শুধুমাত্র ঢাকা শহরে গেরিলা অপারেশনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এই টিমের দুঃসাহসী গেরিলা ‘বিচ্ছু’দের মধ্যে ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, ফিরোজ মাহমুদ, মনির, আরিফুল মাওলা, নজিবুল্লাহ জন, ফেরদৌস নাজমী, আহসান নাওয়াজ, টুনি, মাহবুব, শাহার ও জামিল আহমেদ।
এদের প্রত্যেকেই ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন। কখনো তা প্রকাশ্য দিবালোকেও ঘটেছে। যেমন, রোজার ঈদের আগে বায়তুল মোকাররমে পাক সেনাদের উপস্থিতিতে বিস্ফোরণ ঘটানোর কাজটি রাইসুল ইসলাম আসাদের নেতৃত্বে এই বিচ্ছুরাই করেছিলেন। ডিআইটি ভবনে টেলিভিশনের ট্রান্সমিশন টাওয়ার উড়িয়ে দেওয়ার মতো দুঃসাহসিক কাজটি করেছিলেন জন ও ফেরদৌস, ডিআইটির কর্মী মাহবুব আলীর পূর্ণ সহযোগিতায়—যিনি গেরিলা না হয়েও গেরিলার মতোই কাজ করেছিলেন এই অপারেশনে।
অধিকৃত ঢাকা শহরে এই টিমের গেরিলারা যে দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে, তার আরও অনেক অজানা কাহিনি আছে। তারই একটি ‘গেরিলা পত্রিকা’ —যে কাজটি ঢাকা উত্তরের সিটি টিমের ফিরোজ মাহমুদ, ফেরদৌস নাজমী ও নজিবুল্লাহ জন—এই তিনজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার পরিকল্পনায় হয়েছিল। (এদের মধ্যে জন ও ফেরদৌস ভারতের আগরতলার কাছেই নির্ভরপুরের ট্রেনিং সেন্টার থেকে মাত্র দু’মাসের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে জুন মাসের শেষের দিকে ফিরে আসেন।)
মুক্তিযুদ্ধের কথা জনগণকে জানানো, মুক্তিযুদ্ধের ওপর বিশ্বাস এবং তাঁদের মনোবল ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই এই তিন গেরিলার মনে হয়েছিল—‘কিছু একটা করতেই হবে’। কারণ যুদ্ধকালীন পাকিস্তান সরকার তাদের প্রচারমাধ্যমে বিশ্ববাসীকে এই ধারণা দিচ্ছিল যে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবে চলছে। নির্লজ্জের মতো বিশ্বকে এভাবে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তারা সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। যদিও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সারা বিশ্ব প্রকৃত খবর পেয়ে যাচ্ছিল। সেই সব খবর আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সমস্ত বিদেশি সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যম নিষিদ্ধ করা হয়।
তাই এই তিন গেরিলা সিদ্ধান্ত নিলেন—গেরিলা অপারেশনের পাশাপাশি পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব জোরদার করা এবং মুক্তিযুদ্ধের তৎপরতার কথা প্রচারের জন্য তাঁরা একটি পত্রিকা বের করবেন। যাতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট না হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ঢাকা শহরে ছাত্রছাত্রীদের এসএসসি পরীক্ষা বয়কট করার জন্য গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে ছাপানো একটি ইশতেহার মাসব্যাপী বিলি করেছিলেন। তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নিষিদ্ধ সংবাদপত্র থেকে খবর সংগ্রহ করে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বজনমতের কথা প্রচার করার জন্য এই তিনজন প্রকাশনার উদ্যোগ নেন।
প্রকাশনার কাজে টিমের বাইরে থেকে যোগ দিলেন তাঁদের বন্ধু সোহেল সামাদ। রাতারাতি পত্রিকার নাম ঠিক হলো—‘গেরিলা’।
শুরু হলো পত্রিকা ছাপার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা সংগ্রহ করা। তাদের একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন দরকার। নতুন কোনো মেশিন তাঁদের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। তাই তাঁদের অন্য পথ ধরতে হলো। মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার এক অফিসে গিয়ে হাজির হলেন তাঁরা। দিনদুপুরে ঘুরে বেড়ানো গেরিলাদের কাঁধে বা পকেটে সব সময় অস্ত্র না থাকলেও, মানুষকে ভয় দেখানোর কিছু কৌশল তাঁদের জানা ছিল এবং প্রয়োজনেই তাঁরা তা ব্যবহার করতেন। সেদিন তাঁরা প্রথম মেশিনের মালিককে অনুরোধ করলেন। নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও তাঁকে রাজি করাতে যখন ব্যর্থ হলেন, তখন ভয় দেখিয়ে মেশিনখানা জোর করেই তুলে আনেন।
ফেরদৌস নাজমী নিষিদ্ধ সংবাদপত্র সংগ্রহ করার দায়িত্ব নিলেন। বিদেশি পত্রিকা হাতে পাওয়া তাঁর জন্য কোনো সমস্যা ছিল না। ফেরদৌস নাজমীর বাবা প্রয়াত জিয়াউল আরেফিন নাজমী তখন আমেরিকান এম্বাসির ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিস (ইউএসআইএস) বিভাগের এক্সিবিট শাখার প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ওদেরকে সাহায্য করার জন্য অফিস থেকে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘হেরাল্ড অ্যান্ড ট্রিবিউন’, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’, ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ইত্যাদি পত্রিকা বাড়িতে বসে পড়ার অজুহাতে নিয়ে আসতেন।
এই চারজন তরুণ তখন দশম শ্রেণির স্কুলছাত্র। সারারাত জেগে তাঁরা এসব পত্রিকা থেকে বেছে বেছে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীসংক্রান্ত খবর, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিশ্বজনমতের খবর এবং মুক্তিযুদ্ধে গেরিলাদের দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্তসার ছাপাতেন।
বাছাই করা খবর থেকে সংক্ষেপে লেখার কাজের দায়িত্বে ছিলেন ফিরোজ ও সোহেল। লেআউট-কম্পোজিশন, ইলাস্ট্রেশন এবং স্টেনসিলে খবরগুলো টাইপ করতেন ফেরদৌস। সবশেষে মেশিনে ছাপার দায়িত্বে থাকতেন জন।
গেরিলা অভিযানের অন্যান্য কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এই কজন তরুণ রাত জেগে এই প্রকাশনার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। নজিবুল্লাহ জনের নারিন্দার বাড়ি—মূলত বাড়ির ছাদের ওপরেই ছিল তাদের ‘গেরিলা’ পত্রিকার ছাপাখানা। সেখান থেকেই গেরিলা পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি বের হয়। পত্রিকাটি ফুলস্কেপ পাতার দুই পাতা, অর্থাৎ চার পৃষ্ঠায় ছাপা হতো—অনেকটা নিউজ বুলেটিনের মতো। একেকটি সংখ্যা ছাপা হতো দেড় হাজার কপি।
ওঁরা চারজন ভোরের আলো ফোটার আগেই ‘গেরিলা’ পত্রিকা বাজারের থলিতে ভরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত গোপন সহযোগী এজেন্টদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
এজেন্টরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অতি সতর্কতার সঙ্গে দরজার নিচে রেখে আসত—‘গেরিলা পত্রিকা’।
কিন্তু পরপর তিন সংখ্যা ছাপানোর পর তাঁদের বলা হলো,এই কাজের জন্য এই বাড়ি নিরাপদ নয়। প্রতিবেশীদের অনেকেই তাঁদের আসা-যাওয়া এবং বাড়ির ছাদে সারা রাত আলো জ্বেলে তাঁদের আড্ডাকে স্বাভাবিক নয়—বরং সন্দেহের চোখে দেখছে। খবর অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং নজিবুল্লাহ জনের বাড়ির লোকজনের বিপদ হতে পারে। তাই দেরি না করে মেশিনটি সরিয়ে ফেলা হলো সিদ্ধেশ্বরীতে আরেক সহযোদ্ধা জামিল আহমেদের বাড়ির চিলেকোঠায়। কখনো দিনে, কখনো সারারাত ধরে পত্রিকার কাজ আবার চলতে থাকল। তবে কিছুদিনের মধ্যেই একই কারণে জামিলের বাড়িও ছাড়তে হলো। সমস্ত আয়োজন সরিয়ে আনা হলো এবার তাঁদের আরেক সহযোদ্ধা লুৎফর রহমান বিনু’র খিলগাঁওয়ের বাড়ির ওপরতলায়। কিন্তু এবার তাঁরা আরেক সমস্যায় পড়লেন। বিনুর বাড়ির সামনেই আনসার বাহিনীর হেড অফিস থাকায় দুটো সংখ্যা বের করার পর নিরাপত্তার অভাবে বিনুর বাড়ি থেকেও সরে যেতে হলো। তাঁরা বুঝতে পারলেন, এভাবে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই কাজ চালিয়ে রাখা অসম্ভব।
ফিরোজ ও সোহেল তখন রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুলের ছাত্র। দুজনেই স্কুলের হোস্টেলে থাকতেন। ফেরদৌসের সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। স্কুলের ভেতর-বাইর সবই মোটামুটি তাঁর চেনা। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন—এখন থেকে বাড়িতে বসে লেখালেখির কাজ শেষ করে রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুলের প্রিন্সিপালের অফিসে যে ইলেকট্রিক প্রিন্টিং মেশিনটি রয়েছে, সেটি ব্যবহার করবেন। তাছাড়া কালি ও কাগজ—সবই অফিসে আছে। তাই প্রকাশনার কাজ আরও সহজ হবে এবং তাঁদের আর কাগজ-কালি কিনতে হবে না। তবে অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে এড়িয়ে এই কাজটি করতে হবে খুবই গোপনে। তাই শুধু রাতেই তাঁরা অফিসের তালা খুলে কাজ করবেন। ফেরদৌস ছোট্ট পকেটছুরি দিয়ে তালা খুলতে পারদর্শী ছিলেন। এর মধ্যে তিনি গেরিলা অপারেশনের জন্য ছোট্ট কাঁচির সাহায্যে গাড়ির দরজা খুলে, চাবি ছাড়াই গাড়ি স্টার্ট করার কাজও শিখে ফেলেছিলেন। (তিনি অবশ্য অপারেশনের প্রয়োজন শেষে আবার সুযোগ বুঝে হাইজ্যাক করা গাড়ি যথাস্থানে রেখে দিতেন।) কাজেই তাঁর কাছে তালা খোলা কোনো ব্যাপারই ছিল না।
ওঁরা চারজন সন্ধ্যায় তালা খুলে অফিসে ঢুকে ছাপানোর কাজটা শেষ করে ভোর হওয়ার আগেই ‘গেরিলা’ পত্রিকার কপি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। স্কুলের গার্ড শুধু তাঁদের এই কর্মকাণ্ডের কথা জানত।
এবারও দেড় হাজার কপির মাত্র দুই সংখ্যা বের করার পরই সেই গার্ড জানাল—কাগজ ও কালি হঠাৎ করে কমে যাওয়ায় প্রিন্সিপাল স্যার অ্যাডমিন অফিসে সবাইকে জেরা করছেন। গার্ড এর ধারণা প্রিন্সিপাল সাহেব কিছু একটা সন্দেহ করছেন।
এই ঘটনার পর গেরিলা কর্মীদের পত্রিকা ছাপানোর কাজ বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেল। সেদিনের পর থেকে এই চারজন মুক্তিযোদ্ধার ‘গেরিলা’ পত্রিকা আর কোনোদিন সকালে বাড়ির দরজার নিচে দেখা যায়নি।
নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের এমন অনেক ইতিহাস আজকের প্রজন্মই শুধু নয়, সেই সময়কার অনেক মানুষের কাছেও অজানা রয়ে গেছে। আবার অনেকের স্মৃতি বিস্মৃতিতেও পরিণত হয়েছে।
অল্পদিনের এই ‘গেরিলা’ পত্রিকাটি হয়তো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। যাদুঘরে হয়তো একটি ছবি আছে—কিন্তু এদের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে কি না, সন্দেহ।
স্বাধীনতার সংগ্রামে একেবারে নিজস্ব ভাবনা থেকে একটি গুপ্ত পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরির এই প্রচেষ্টা ক্ষণকালের হলেও ১৫–১৬ বছরের এই চার তরুণের
বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা ও সাহস নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। স্বাধীনতার ইতিহাসে ‘গেরিলা’ পত্রিকা ও তাদের উল্লেখযোগ্য অবদানের মূল্য কম নয়। তবে কালের গর্ভে এমন অনেক ইতিহাস প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য—নজিবুল্লাহ জন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়া শুরুর অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। প্রবাসী ফেরদৌস নাজমী দেশে গিয়ে আবেদন করে তালিকাভুক্ত হওয়ার কষ্ট করতে চাননি। মানিক ভাইয়ের সনদ নম্বর ৩২৪ হলেও তিনি নিজে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
. . .

যেন এক দ্বৈত সত্তার শিল্পী: একদিকে তিনি গল্পের কারিগর, শব্দের তুলিতে আঁকেন জীবনের ছবি; অন্যদিকে সময়ের দর্পণ, যেখানে রাজনীতি ও সমাজের নির্মোহ প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের নাগরিক হলেও, তাঁর বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার জগৎজুড়ে থাকে প্রতিদিনের বাংলাদেশ। তাঁর গল্পগুলো যেন সময়ের নীরব সাক্ষী, যেখানে ইতিহাসের প্রাচীন পলিমাটি মিশে থাকে নৃতত্ত্বের গভীর শিকড়ের সাথে। এই মিশ্রণে জন্ম নেয় এক নির্দয় মায়ার জগৎ, যা পাঠককে আকর্ষণও করে, আবার বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড় করায়। তিনি শব্দের ফেরিওয়ালা নন, তিনি ওজন করে বাক্য সাজান না; বরং তিনি এক অনিবার্য প্রশ্নের জন্মদাত্রী, তাঁর কলম যেন এক তীব্র জিজ্ঞাসা, এবং পাঠকের মনে নতুন ভাবনার জন্ম দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। রাজিয়া নাজমী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার সাথে, একটি যুক্তিগ্রাহ্য ও আইনসঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে আইনশাস্ত্রেও ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বার কাউন্সিলের সনদ লাভ করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করছেন।
প্রকাশিত বই – গল্পগ্রন্থ – চৌকাঠের বাইরে ,জলাগুন উপন্যাস- আধখানা হলুদ সুর্য
