ঘুমের জাল
আমার ভীষণ, বড্ড ঘুম পায় মহাপ্রাণ সমাজপতি
কোনভাবেই চোখ মেলে তাকাতে পারি না আমি,
খালি ঘুম পায় আমার, বেআব্রু আঠালো তন্দ্রা।
বুঝে ফেলি— এরমধ্যেই তোমরা জেনে গ্যাছো
আমার স্বপ্নের কোন সীমা পরিসীমা নাই
নাই তার গজ ফিতা, না হয় একবিন্দুও কাহিল
এই যে আমার দুদ্দাড় এভাবে ঘুম পায়
সে-ই তো স্বাভাবিক, ভেবে কও, নয় এমনিই বলো।
ঘুমিয়ে না পড়লে আমি স্বপ্ন দেখবো কীভাবে?
স্বপ্নগুলো নেড়েচেড়ে দেখবার একফোঁটা শক্তি নাই
সারাদিন এতো পরিশ্রম যায়— লগি টানা
চাক্কা চালানো, পেটের ধান্দায় যাকে তাকে চাক্কু মারা-
সবই করি, সারাদিন খালি পেটে শুয়ে থাকি।
চোখ লেগে যায় ক্লান্তিতে, এতোটাই কাহিল ভাই
কোনভাবেই চোখ খোলা রাখতে পারি না-
ভালো তো লাগে, কী বলো— আমি বরং ঘুমিয়েই যাই!
না ঘুমালে এই আলিসান লম্বা স্বপ্ন দেখবো কীভাবে?
মানুষভর্তি কুয়াশা
কথা বলতে কথা লাগে না, কেবল নির্দয় পাথর লাগে
ভালোবাসতে মায়া লাগে না, লাগে মৃত্যুগ্রহণের পদচিহ্ন।
লাভ হয় না তেমন কিছু যদি ইজেলে ধরে রাখি সন্তাপ
পূর্বানুমান ছাড়া ভূমিকম্প হয়, আসে জলরঙের স্থিতিও
ফলে নতমুখে জেগে থাকে একশো আটটি তীব্র নিরাশা।
কারো কাছে যাবার নেই আর, পূর্বপুরুষের তৃষ্ণা নিখোঁজ
এমন পিপাসাবিহীন মানুষ এর আগে দেখিনি কোনদিন
হাটভর্তি মানুষ, মানুষভর্তি কুয়াশার ট্রেন ছুটে যায়
কোথায় যে যায় ট্রেন, ঘোড়ার গাড়ি কোন খাদের গম্বুজ
দেখি একমিছিল মানুষ সহসা জলপাইগাছ হয়ে যায়।
ট্রাকভর্তি পুলিশ নামছে হাঁকিয়ে আগামীকালের চাবুক
চুম্বনের মাঝখানে কারফিউ— গর্ভবতী যাদুকাটা উন্মুখ।
বাহামাব্রিজ
মনে হচ্ছে বুকের উপর একটা হাট ভেঙে যাচ্ছে আজ
হাততালি আর মার্বেলের উপর ভেঙে গড়িয়ে পড়ছে
শনিবারের হাট— গরুদের মায়াভরা চোখ কাঁপছে কেবল।
হাট ভেঙে গেলে ধূলা ওড়ে দিগন্তে পরিপার্শ্বের সিথানে
মন বলছে, বারবার আমি কোথায় যে চলে যাচ্ছি আমি!
ঘুমের ওপারে দেবদারু আর শামুকের কল্লোলের পাশে।
দিনগুলো এখানে আমার বুঝি হরিণের ঝাঁক রুরু
বিকেলগুলো, সন্ধ্যা বইয়ের পাতাগুলো মেলে আছে
মেলে দেয় তারা আমার ঘূর্ণিপাক স্তব্ধতার ভিতর
এখানে স্মৃতিরা বুঝি বাইবেলের ব্যথিত মর্ম প্রয়াণ।
সুসমাচার তরঙ্গে খয়েরি পাড় মথি মার্ক লুক ও যোহান
বেদের ভিতর থেকে উঠে আসা শ্রুতি তারা বলে
আগত জন্মের গায়ত্রী স্ফূরণ, মৃত্যুঞ্জয় আর আদি ওঙ্কার।
দিনযাপনে মিহি মেঘের ক্ষরণ কীভাবে হয় এতোটা ভার
কখনও সে ঝড় জল সংক্ষোভে দৈবাৎ রক্ত স্মৃতির ঘ্রাণে
অতীত ও ভবিতব্যের মাঝখানে উত্থিত ঢেউয়ের মাথায়
হাত বাড়ায় চন্দন ও রঙের মালা অচেনা রূপকথার টানে।
মহাকাব্যের কররেখা
পোকামাকড়ের সাথে শস্যের কণা ভাগ করে
খায় পথভোলা নড়বড়ে নদীপাড়ের একলা মানুষ,
রাস্তার নুড়ি জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকে দুঃখের খড়িমাটি
ঘর বাঁধে ঝড়-ঝঞ্ঝার মুখে ভাঙা পালকের নিচে
মৃত্যু তাকে সোনার বাটায় সুগন্ধি ছুঁইয়ে দেয় অমরতা।
খোয়াব এক বাড়িয়ে ধরে, বলে যে চোখ বুঁজে দেখো
তুমিও অমর হতে জানো, তুমিও অক্ষয় পাথর এক।
মার্চ তারাসংহার আদিগন্ত উদাম গায়ের চাষাকে
আগুনে ঝলসানো জলনির্ণীত দুঃখ পাড়ের লখাইকে
একমোচড়ে এনে দেয় মহাকাব্যের স্থিতি অস্থিতি।
কে যে এক লহমায় হয়ে ওঠে সন্তাপে পরম অর্জুন,
হাসান-হোসেন, হাতে লাফায় ইকারুসের দুর্নিবার
আমাদেরই চোখের সামনে জবুথবু রাখাল এক
ঘুরে দাঁড়ায় ইলিয়াডের এচিলিস, কারখানা মজুর
কী এক কাঠমিস্ত্রী তন্তুবায় তমসার দিব্যি ওডিসিউস।
হেঁশেল থেকে উঠে আসা বোন আমার হয় মোরিগ্যান,
কী এক জলটঙ্গী নারী আচমকা জেগে ওঠে কুন্তি।
এই মাসে শৌর্যের বাঁকে হিসহিস রক্তাভ দুর্যোধন
এভাবেই ডোবে আর ভাসে রবিশস্য সমাজের মার্চ
এমন এক জমাট কালের নাভিমূল আমাদের গাঁথে
আমরাও ব্যথাসিদ্ধ হই নির্লিপ্ত কররেখার ভাঁজে ভাঁজে।
বন্দিশ
যা একবার চলে যায় তা দ্বিতীয়বার ফিরে আসে না।
আরও মায়াবী লেখার ভিড়ে টি এস এলিয়েট লেখেন,
জগৎ জানে হেরাক্লিটাসও তেমনই বলেন।
সময়কে কীভাবে পিছাবো, আগাবোই বা—
যে যায় তবে যায় না, আসে কিন্তু আসে না—
কেবল হয় ত্রিকোণমিতি, কিবা বৃত্তাকার বিন্যাস।
আমার চোখের সামনে একটি রাষ্ট্রীয় গেইজ
কেবল এবড়োখেবড়ো পাটের একটি জানালা,
অনড় জংধরা প্রাণের ধূলা,কেবল বহতা
তার নাম সন্ধ্যা-সকাল, কাল কৃষ্ণ অনন্ত সময় বন্দিশ।
তুমিও যে সময় হয়েছো— না যাও, না থামো,
না বহো- স্তব্ধতার বৃষ্টি অবিরল, কেবলই পাথর, নীরবে রহো।

কবি, নাট্যকার, অনুবাদক।
কবিতা : পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর।
নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো। দূরত্বের সুফিয়ানা।
প্যারাবল : হৃদপেয়ারার সুবাস।
ভাষান্তরিত কবিতা : ঢেউগুলো যমজ বোন।
জালালউদ্দিন রুমির কবিতা, মসনবি : মোরাকাবা ও জলসংগ্রহ।
ছিন্নগদ্য : সঙ্গে প্রাণের খেলা।
নাটক : নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে। পুণ্যাহ। আবের পাঙখা লৈয়া। জুজুবুড়ি। চন্দ্রপুরাণ। পানিবালা। বাঘ। পরীগাঁও। প্রত্ন প্রতিমা। ইলেকশন বাজারজাতকরণ কোম্পানি লিমিটেড। এক যে আছেন দুই হুজুর। পিঁয়াজ কাটার ইতিহাস। ডুফি কীর্তন। নুনমধু টিপসই। পানিফল সংবেদ।।
