Sunday, May 10, 2026
Homeঅন্যভাষাব্রেইতেন ব্রেতেনবাখের গদ্য পাঠক, সুরভিত পাঠক । এমদাদ রহমান

ব্রেইতেন ব্রেতেনবাখের গদ্য পাঠক, সুরভিত পাঠক । এমদাদ রহমান

[ব্রেইতেন ব্রেইতেনবাখ দক্ষিণ আফ্রিকার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, চিত্রকর,  স্মৃতিকথক। আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কর্মী। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জন্ম। তাঁর কবিতা রাজনৈতিক, তবে আঙ্গিকগত দিক থেকে সমকালীন সাহিত্যে তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। লেখা অনুবাদ হয়েছে ডাচ, ইংরেজি, ফরাসি আর জার্মান ভাষায়। ১৯৬০ সালে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের কারণে তাকে ফ্রান্সে পালিয়ে যেতে হয়। ১৯৬৪ সালে বের হয় প্রথম কবিতার বই ‘দি আয়রন কাউ মাস্ট সোয়াট’, বোদ্ধামহলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পায় বইটি। ১৯৭৫ সালে ফিরে আসেন স্বদেশে, সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার হন। প্রিতরিয়ায় ৯ বছরের কারাজীবন দেয়া হয় তাকে। কারাবন্দী অবস্থাতেই লেখা হয় পাঁচ খণ্ডের কবিতাবই আর বেশ কিছু গদ্য। লেখেন জেলখানার স্মৃতি ‘কনফেশনস অভ অ্যান আলবিনো টেররিস্ট’। মুক্তি পান ১৯৮২ সালে। মুক্তির পর চলে যান ফ্রান্সে, সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস ‘মেমোরি অভ ডাস্ট অ্যান্ড স্নো’। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেন উপন্যাসের ফর্মে। ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর  গদ্যের বই ‘ইনটিমেইট স্ট্রেঞ্জার’। অনূদিত গদ্যটি এ-বই থেকেই নেয়া।]

পাঠক, সুরভিত পাঠক, আমি জানি আমি তোমাকে অনেক বেশিই জিজ্ঞেস করছি,  তুমিও আমার ব্যাপারে যথেষ্ট ধৈর্যশীল আর তুমি অপেক্ষা করছ আমার গন্তব্যহীন, পরিকল্পনাহীন পথ-চলার অর্থটুকু বুঝে নেবার জন্য (যদি কোথাও কিছু পাওয়া যায়, যদি কখনও জানতে পারা যায়!), কিন্তু দীর্ঘক্ষণ, দীর্ঘ সময় ধরে আমি কেবলই তোমার কাছাকাছি হতে চাইছি। তুমিও ততোক্ষণ আমার দিকে, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে পৌঁছচ্ছি; অবশেষে, অবশেষে তুমি আমার বাহুবেষ্টনীর ভিতর দীর্ঘশ্বাস ফেললে!

এই হল আমার প্রিয়তম আকাঙ্ক্ষা। শব্দের ভিতর দিয়ে তোমাকে আমার সংবেদনটুকু জানান দিচ্ছি, তোমাকে উস্কে দেবার এটাই আমার সবচে মোক্ষম পথ। পাঠক, তুমি এখনও বয়সে তরুণ এবং সৌন্দর্যে অপরূপা। তোমার ঠোঁটে কী সুন্দর কুঞ্চন, তুমি মাঝে মাঝে আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছ তোমার পাপড়ির গোপনতায়; তবু, সাহস করেই আমি ভাবছি যে তোমার হৃদয়ে কি হঠাৎ ধ্বক করে উঠেনি, যখন তুমি পৃষ্ঠাগুলি উলটাচ্ছিলে? তুমি আমাকে এখন পর্যন্ত কতোটুক জেনেছ? (কিংবা ভাবছ যে- জানতে পেরেছ!), রাতে, অবিরাম তোমাকে খুঁজে মরেছি, যখন আমি তোমাকে স্বপ্নে দেখছিলাম আর সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি আমার বালিশে তোমার সুবাসিত যৌনগন্ধ লেগে আছে!

এবং এখন, আমি কোনভাবেই চাইব না তোমাকে বেঁধে ফেলতে, তোমার উদ্দাম স্বাধীনতা কেড়ে নিতে, তোমার মুক্তির পথ কঠিন করে দিতে। হয়ত, ধীরে ধীরে আমরা প্রেমের বন্ধনেই জড়িয়ে যাব পরস্পর- কোথাও কোনও অন্ত নেই এমনভাবে কিংবা যার কোনও নকশাও নেই! আর আমার গল্পটি এগিয়ে আমাদের দু’জনের নিজস্ব গল্প হয়ে উঠবে এমনভাবে— সেই শ্বেতাঙ্গ সূর্য দেবতা হুইটজিলোপুচৎলি’র মত, যিনি প্রকাশিত হন দিবসে, গ্রীষ্মকালে, মহাদেশের দক্ষিণে; প্রকাশিত হন তিনি আগুনরূপে; আর সেই কৃষ্ণ টেজকটিলপকা, যিনি একই সঙ্গে দেবি এবং পুরুষরূপে একজন দেবতা হিসাবেও বিরাজমান, যিনি সূর্যকে অস্তে নিয়ে যান, পৃথিবীতে রাত নিয়ে আসেন, আহ্নিকগতি নিয়ন্ত্রণ করেন, নিয়ন্ত্রণ করেন এই আদিঅন্তহীন মহাকাশ, একই সঙ্গে যিনি শীতলা- শীতের অধিকর্তা। অধিকর্তা পৃথিবীর উত্তরের আর বিপুল জলরাশির। হ্যাঁ, অবশেষে এই দুই বিপরীত দেবতা একসঙ্গে মিলিত হন।

আমাদের দু’জনের অস্তিত্বের এই বিদ্যমানতা, এই স্থির রূপ এখন এটাই নিশ্চিত করবে যে বইটি খুব সুন্দর এক ভারসাম্যের মধ্যে অবস্থান করছে। তুমি কোথায়? আমি সুনিশ্চিতভাবেই তোমার সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে চাইছি, আমি তোমাকে খুঁজে চলেছি অবিরাম দিনে আর রাতে। হয়ত আমি নিজেকেই খুঁজে মরছি, ‘হয়ত’ বলার কারণ আমি শুধুমাত্র তোমার মনেই অবস্থান করছি, কিন্তু আমি তোমার কাছে আমাকে গড়ে তুলছি শব্দ-সমষ্টি দিয়ে, তোমার পাঠপদ্ধতির ভিতর দিয়ে আর তোমার আমার গ্রহণ বর্জনের ভিতর দিয়ে। এই বইটিই হবে আমাদের মুখোমুখিতে দেখা হয়ে যাবার মঞ্চ, আমাদের অস্তিত্বের আদানপ্রদানের স্থান। অবশ্যই, বইটিকে আমি এমনভাবে লিখছি, যে-বিছানায় আমরা ঘুমাব, সেখানেই তোমাকে কানে কানে ফিসফিস করে যেন গল্পগুলি বলে দিতে পারি আর আমি কক্ষনই চাইব না তোমাকে অধৈর্য করে তুলতে কিন্তু তুমি সম্ভবত বেশিক্ষণ শুনতে চাইবে না। আমার দিকে তাকাবে আড়চোখে আর জলের তলায় ডুবে যাবে শব্দ।

কোথায় তুমি, কোথায়? একজনকে ছাড়া আরেকজন বাঁচতে পারবে না। আমি আজ বলছি বয়োবৃদ্ধ দু’জন যমজ নারীর কথা। দু’জনই তাদের স্বামী হারিয়েছেন, হারিয়েছেন মিলনের চরম পুলকের সেই স্মৃতিগুলি আর হারিয়েছেন নিজেদের নাম। বিকালবেলার অস্তগামী সূর্যের রোদউষ্ণ এক কক্ষে তারা দু’জন বসে রয়েছেন। প্রায় অস্পষ্ট, ভঙ্গুর, শোকার্ত কণ্ঠে একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করলেন—বলো, আমি কি বেঁচে আছি?

.  .  .

এমদাদ রহমান
এমদাদ রহমান
নিজ গ্রামের রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে শমশেরনগর এএটিএম উচ্চবিদ্যালয় এবং কমলগঞ্জ গণ মহাবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি’র পর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও লোকপ্রশাসন বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেন। শৈশবের বেশিরভাগ কেটেছে গ্রামে এবং বাবার চাকরিসূত্রে বিভিন্ন চা বাগানে। গল্প দিয়েই লেখালেখির শুরু। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে প্রথম গল্পসংকলন ‘পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প’। অনুবাদ গ্রন্থ বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার ‘নৈঃশব্দ্যের সংলাপ’ ২০২০, ‘অরুন্ধতী রায়ের প্যারিস রিভিউ সাক্ষাৎকার’ ২০২২ এর বের হয়।
এইরকম আরও পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
ad place