Thursday, March 26, 2026
Homeসবিশেষগদ্যবাংলা লোকসংগীতের প্রেক্ষাপট : সিলেটের লোকগানপ্রসঙ্গ । সুমন বনিক

বাংলা লোকসংগীতের প্রেক্ষাপট : সিলেটের লোকগানপ্রসঙ্গ । সুমন বনিক

বাংলা লোক সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখা লোকসঙ্গীত। বাংলাদেশের লোকগান শুধু সংগীত নয়, বরং এ দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের জীবনধারার এক শক্তিশালী প্রকাশ। লোকসংগীত প্রধানত গ্রামবাংলার প্রকৃতিজ মানুষের হৃদয়ের গহীন থেকে উৎসারিত, অনুভূতি এদের জনক আর মুখ এদের পরিবেশন,পরিচর্যা ও চর্চার কেন্দ্র। লোকসংগীতের স্রষ্টাগণ প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না-হলেও জ্ঞানের জ্যোতিতে তাঁরা উদ্ভাসিত। মরমিসাধক,বাউল,ফকির—লালন শাহ, হাছন রাজা, রাধারমণ, পাগলা কানাই, মনমোহন দত্ত, শাহ আবদুল করিম প্রমুখ মরমিসাধক/বাউল গান রচনা করতেন আবার সুর বাঁধতেন। তাঁদের রচিত গানে আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, আবার আঞ্চলিক মানসিকতারও সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলাদেশের মরমিগান বা বাউল-ফকিরের গানের ধারা লালিত ও চর্চা হয়েছে/ হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত পির-ফকির, বাউল-সাধক এবং সাধু-আউলিয়ার মাজার ও আখড়াকে কেন্দ্র করে। লিখিত এবং অলিখিত এই দুটি ফর্মে—লোকসংগীত সীমাবদ্ধ হলেও, সর্বত্র লোকগানের বিস্তার বা প্রসারণ ঘটেছে মৌখিকভাবেই। বাংলাদেশ বৈচিত্রময় লোকসংগীতের ভাণ্ডার। এগুলোর বিচিত্রতা রয়েছে গানের  কথায়, সুরে,তালে এবং পরিবেশনের পরিবেশে। ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য লোকসংগীতের বিষয়বস্তু ও বিস্তারের উপর ভিত্তি করে লোকসংগীতকে পাঁচটি শ্রেনিতে ভাগ করেছেন: আঞ্চলিক লোকসংগীত, ব্যবহারিক লোকসংগীত,আনুষ্ঠানিক লোকসংগীত, কর্মসংগীত ও প্রেম সংগীত( আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোকসাহিত্য)।উল্লেখ্য, এখানে তত্ত্ব সংগীতটি উপেক্ষিত। ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক লোকসংগীতকে ১০টি ভাগে ভাগ করেছেন :

০১) প্রেমসংগীত: নর-নারীর পরস্পরের মিলন, বিরহ-বিচ্ছেদ, অনুরাগ-বিরাগ ইত্যাদি অনুভূতি প্রকাশ পায় প্রেম সংগীতে।
২) নৃত্য সংগীত: নৃত্যের প্রাধান্যযুক্ত সংগীতই হলো নৃত্যগীত।
৩) সহেলা সংগীত: নারী কন্ঠের সমবেত সংগীতই হলো সহেলা সংগীত। যেমন -মেয়েলী গীত।
৪)শ্রম সংগীত: শ্রম লাঘব কিংবা শ্রমের অনুপ্রেরণাজাত সংগীতই হলো শ্রম সংগীত। যেমন – ছাদ পেটানো, ভার উত্তোলন, নলকূপ স্থাপন ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত সংগীত।
৫) কৃষি সংগীত: কৃষকদের কর্ম অথবা অবসর সময়ে চাষাবাদকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত গান গীত হয়ে থাকে, তাই হলো কৃষি সংগীত। যেমন-  ধান কাটার সময় গীত সংগীত।
৬) অনুষ্ঠান/আনুষ্ঠানিক সংগীত: সামাজিক উৎসব বা পার্বণে যে লোকগান গীত হয় তা আনুষ্ঠানিক সংগীত হিশেবে সংজ্ঞায়িত। যেমন – বিয়ের গান, সূর্যব্রতের গান ইত্যাদি
৭) পটুয়া সংগীত:পটকে কেন্দ্র করে রচিত সংগীত হলো পটুয়া সংগীত।
৮) শোক সংগীত: শোকানুভূতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গানই হলো শোক সংগীত।
৯)  ভক্তি সংগীত: স্রষ্টার স্তব-স্তুতি- মহিমা বর্ণনা করে  ভক্তিমূলক গান গাওয়া হয় ।
১০) তত্ত্ব সংগীত: মুর্শিদের নিগূঢ়তত্ত্বের অনুসন্ধান করে প্রণীত সংগীতই হল তত্ত্বসংগীত।

আবার, ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী লোকসংগীতকে ৬ ভাগে ভাগ করেছেন— আঞ্চলিক লোকসংগীত, ব্যবহারিক লোকসংগীত, হাসির লোকসংগীত,  কর্ম লোকসংগীত,  প্রেম লোকসংগীত,  ও বারমাসী লোকসংগীত।  উল্লেখ্য, তত্ত্ব সংগীতের মত সমৃদ্ধ লোকসংগীতের ধারাটি আশরাফ সিদ্দিকী কর্তৃক লোকসংগীত-শ্রেনিকরণে আমরা পাই না। ডক্টর আনোয়ারুল করিম নিগূঢ়তত্ত্বের ভিত্তিতে লোকসংগীতকে ২ভাগে ভাগ করেছেন : আধ্যাত্মিক বা ভক্তিমূলক সংগীত, পার্থিব বা জাগতিক সংগীত। কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের লোকসংগীতের শ্রেনিবিন্যাস মূলত কোনোটাই পূর্ণাঙ্গ নয়। তবে, বাংলাদেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ লোকসংগীতে সমৃদ্ধ হলেও সুর, ভাববাদ কিংবা দর্শনের দিক দিয়ে এগুলোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুব-একটা নেই। আবহমান বাংলার লোকগানের যে বৈভব  ও বৈচিত্র্য তা এ অঞ্চলের সমাজ সংস্কৃতি ধর্ম ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে সনাক্ত করে খুব গভীরভাবে। একইসঙ্গে এসব গানের মধ্যে বাঙালির মৌলিক চিন্তাধারার বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। শাশ্বত বাঙালির যাপিত জীবনজাত বিশ্বাস বোধ দর্শনের একটা সংহত প্রকাশ আমরা বাংলার

লোকসংগীতে পাই।

‘বঙ্গীয় লোকসঙ্গীত রত্নাকর’ (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছেন, “প্রাচীনতম কাল হইতে আরম্ভকরিয়া আধুনিকতম কাল পর্যন্ত বাঙ্গালীর সাধনার শ্রেষ্ঠ সম্পদই তাহার সঙ্গীত। বাঙ্গালীর ধ্যান ধারণা সামাজিক আচার আচরণ, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জীবনের সুখ দুঃখের অনুভূতি সবই সঙ্গীত সাধনায় যে বৈচিত্র্য প্রকাশ পাইয়াছে, তাহার সঙ্গে পরিচয় স্থাপন করিতে না পারিলে বাঙ্গালীর চরিত্র এবং তাহার জাতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা যাইবে না।”

লোকসংগীত  আবহমানকাল ধরে বাংলায় বিকাশ ও বিস্তৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের লোকসংগীতের রূপ ও বিষয়গত বৈচিত্র্য চিরায়ত বাংলার মৃত্তিকাসংলগ্ন চেতনার জারকরসে সিক্ত। লোকগানের বাণী ও সুর—প্রকৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য,  প্রেম- বিরহ, জীবাত্মা-পরমাত্মাকে ধারণ করে । মূলত, বাঙালির লোকায়ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার লোকসংগীত/লোকগান। লোকসংগীত আধুনিক যে-কোনো সংগীতের মতোই বাণী ও সুরের সমন্বিত রূপ। তবে, লোকসংগীতের বাণীর ভাষা আঞ্চলিকতায় পরিপূর্ণ এবং সুরও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সে কারণে লোকসংগীতের মধ্যে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পরিবেশের প্রভাব বিরাজিত। তাই, লোকসংগীতের বাণী/লিরিকের ভাষা আঞ্চলিক উপভাষায় প্রভাবিত। লোকসংগীত রচয়িতা/ পদকর্তার   চোখের সামনে ভেসে উঠে তাঁর আপন পারিপার্শ্বিক ভূবন— নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাওর,  মাঠ-ঘাট, বন-বনানী , উন্মুক্ত প্রান্তর, উদার নীলাকাশ, জীবজন্তু, ষড়ঋতুর রূপ বৈচিত্র্য ইত্যাদি । লোকসংগীতে তাই প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, আর এভাবেই বাংলাদেশে লোকসংগীতের ভৌগলিক অঞ্চল গড়ে উঠেছে—সেইসূত্র ধরে সিলেটের লোকসংগীতের বহুমাত্রিক ধারা প্রবাহিত এবং প্রচলিত।

০২

সিলেট বাংলাদেশের একটি প্রাচীন জনপদ । ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ তে সূরমস (৪-১-১৭০) নামে যে একটি জনপদের কথা বলা হয়েছে তা সুরমা উপত্যকা।  সপ্তম শতাব্দীতে চৈনিক পরিব্রাজক “হিউ এন সাঙ্ এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ‘সিযুকি’ (Si-yu-ki) গ্রন্থে শি-লি-চ-ট-ল বলে একটি রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে, সেটাই প্রাচীন শ্রীহট্ট এবং এখানে শ্রীহট্টকে একটি স্বতন্ত্র প্রাচীন রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।”( সুজিৎ চৌধুরী প্রণীত শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস

১ম খণ্ড

এছাড়া “আরব পর্যটক সোলায়মান ছয়রাফী বঙ্গোপসাগর অতিক্রমকালে বাংলার বিখ্যাত বন্দর ‘সেলাহেটে’র কথা উল্লেখ করেছেন। নবম শতাব্দীতে, দশম শতাব্দীতে উৎকীর্ণ শ্রীচন্দ্রের তাম্রশাসনে ‘শ্রীহট্ট মণ্ডল’ এবং একাদশ শতাব্দীতে উৎকীর্ণ গোবিন্দকেশব দেবের তাম্রশাসনে এর উল্লেখ রয়েছে ‘শ্রীহট্টরাজ্য’ বলে। আর প্রায় একই সময়ে মহাপণ্ডিত আলবেরুনী তাঁর বিখ্যাত ‘কিতাবুল হিন্দ’ গ্রন্থে এ রাজ্যের নামোল্লেখ করেছেন ‘শিলাহাত’ বলে।১৮৭২-৭৩ সালে আবিষ্কৃত ভাটেরার তাম্র শাসন, ১৯১২ সালে আবিষ্কৃত নিধনপুর তাম্রশাসন, ১৯৬৩ সালে আবিষ্কৃত কালাপুর তাম্রশাসন এবং ১৯৬৫ সালে আবিষ্কৃত পশ্চিমভাগ তাম্রশাসন থেকেও সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস জানা যায়। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে আরও জানা যায়, প্রাচীন গৌড় লাউড় ও জৈন্তা রাজ্যসহ ইটা, তরফ প্রভৃতি সামন্তরাজ্য সিলেটের অন্তর্ভূত ছিল। বর্তমান সিলেট বিভাগ ইতিহাসের বহুবিধ ভাঙ্গাগড়ার ফসল। ‘সিলেট’ শব্দটি বহুল অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ নিয়েই বৃহত্তর সিলেটের আয়তনিক সীমা।

সিলেটঅঞ্চল সুপ্রাচীনকাল থেকেই সুসভ্য অঞ্চল হিশেবে খ্যাত, সিলেটের সাহিত্য চর্চার ইতিহাসও সুপ্রাচীন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে যত প্রাচীন সংস্কৃত পুথি পাওয়া গেছে তন্মধ্যে সিলেটের পণ্ডিতদের রচিত গ্রন্থের সংখ্যাই বেশি। “প্রাচীনকালে মিথিলা ছিল সংস্কৃত চর্চার একটি প্রধান কেন্দ্র। মৈথিল ব্রাহ্মণেরা শ্রীহট্টে এসে বসতি স্থাপন করায় মধ্যযুগে শ্রীহট্টে সংস্কৃত চর্চার সূত্রপাত হয়। মধ্যযুগের আধ্যাত্মবাদ ও মানবতাবাদের গঙ্গা যমুনা মিলিত হয়েছিল যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মান্দোলনে, তার জন্ম হয়েছিল শ্রীহট্টের নাভিকেন্দ্র থেকে।”( ড.জন্মজিৎ  রায়, সার্ধ শতকের বরাক উপত্যকা: সাহিত্য ও সমাজ, করিমগঞ্জ  ১৯৯৪, পৃ.৩)।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ, বাঙালি সাহিত্য মানসের উর্বর ফসল। চর্যাপদের সকল রচয়িতা এক স্থানে নয়। নানা কালে তাঁরা চর্যা রচনা করেছেন। কাহ্নপা সহ বেশ কয়েকজন চর্যাকার যে সিলেটের সন্তান ছিলেন সেটা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করেছেন অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলী তাঁর “চর্যাপদে সিলেটীভাষা’ (সিলেট ১৯৯৩) গ্রন্থে। চর্যাপদে ব্যবহৃত অনেক শব্দ এখনও সিলেট অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়-যা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে প্রচলিত নয়। মূলত,  সিলেট অঞ্চল লোকসাহিত্যের অমূল্য ভাণ্ডার। তাই,  বিশিষ্ট ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান বলেছেন—” লোকসাহিত্য সাধনার সিলেটের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল।  বিষয়ের বৈচিত্র্যের ,ভাবের গভীরতায় এবং পরিমাণের বিশালতায় সিলেটের লোকসংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পুনর্গঠনের স্বার্থে এই রত্নভাণ্ডারের সুশৃঙ্খল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এর জন্যে চাই নিরন্তর চর্চা ও নির্মোহ বিশ্লেষণধর্মী পঠন-পাঠন। “(শামসুজ্জামান খান,  শুভেচ্ছা বাণী, স্মারকগ্রন্থ ‘৯২, হারুন আকবর সম্পাদিত,  জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ,সিলেট ১৯৯২)।

সিলেটের লোসংস্কৃতি সম্পর্কে ফোকলোর বিশেষজ্ঞ ড. আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, “ঐতিহাসিক স্থান সিলেট তথা জালালাবাদ সভ্যতা সংস্কৃতির চারণ ভূমিরূপে সুপরিচিত। লোক সংস্কৃতির অফুরন্ত ভাণ্ডার বুকে ধারণ করে এ ভূখণ্ড মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে উজ্জ্বলতর অবদান রেখে চলছে যুগ যুগ ধরে যা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আসছে বহু শতাব্দী থেকে। লোকসংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও এ ভূখণ্ডের অবদান অপরিসীম এবং নিবেদিত প্রাণ কর্মীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। “( ড. আশরাফ সিদ্দিকী, শুভেচ্ছা বাণী, জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ স্মারকগ্রন্থ,  হারুন আকবর সম্পাদিত ,সিলেট ১৯৯৬)। সিলেটের লোকসাহিত্যের উপাদান/বিষয়বৈচিত্র্য সিলেটঅঞ্চলেই বিদ্যমান, অন্য কোথাও এর তেমন প্রচলন নেই। এ প্রসঙ্গে মালসীগান, ভট্টকবিতা, ত্রিনাথের গান, গোবিন্দভোগের গান, ডরাই পূজার গান, ঘাটুগান, আরি গান, মালজোড়া গান, ধামাইল গীত, বারোমাসি, বিয়ের গীত, পই, বাউল গান, মারফতি গান, প্রবাদ, ধামাইল, সারিগান, গাজির গান, জারিগান ইত্যাদি অসংখ্য লোকউপাদানে সিলেট অঞ্চল ঋদ্ধ হয়েছে।  মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন সিলেটের লোকসাহিত্য সম্পদকে সাঁইত্রিশ ভাগে ভাগ করেছেন। যথা: ১. বারমাসী, ২. গীত বা লাছাড়ী গান, ৩. ছাইয়া (ছড়া), ৪. দৃষ্টান্ত, ৫. পই (ছোট ছোট পদ্য) ৬. বাউলগান, ৭. মারফতি গান, ৮. প্রবাদ, ৯. কথার কথা (কথার সঙ্গে যে কথা আসে), ১০. ধামালী, ১১. ডোরা, ১২, সারিগান, ১৩. গাজির গান, ১৪. জারিগান, ১৫. হাজিরাত গান, ১৬. ঘাটু গান, ১৭. উলী (হোলী বা দোল) গান, ১৮. দুঃখের গান, ১৯. অচরিত (অদ্ভূত্যগান, ২০. মুছিয়া গান, ২১. বান্ধাগান, ২২, হেঁয়ালি শ্লোক, ২৩. চটুকীগান, ১৪. ভারত (বিবরণ) গান, ২৫. ভাঙ্গানী শিল্পক, ২৬. বয়ান (বর্ণনা), ২৭, রং-চং, ২৮, ডাক (খেলার), ১৯. ফাঁকি কথা (ঠকান কথা), ৩০. আউল কথা (একটা পদ আরত্তি করতে করতে কথা এলোমেলো বা আউলা জাউলা হয়ে পড়ে), ৩১. প্যাচের কথা (কঠিন উত্তর, চিন্তাপূর্ণ বাক্যাবলী), ৩২, টক্কর কথা (উত্তর দানে প্রার্থীকে প্রার্থনায় বঞ্চিত করা), ৩৩. ইশারা কথা (ইঙ্গিতে বিষয় প্রকাশক প্যাচের কথা), ৩৪ হেঁয়ালি অঙ্ক বা হিসাব (কঠিন স্তরের চিন্তাযুক্ত হিসাব), ৩৫. লোক সাহিত্য বা চরিত্র গঠন ও শিক্ষামূলক গল্প, ৩৬. ভাট কবিতা (ভট্ট কাব্য), ৩৭. জনসাহিত্য ইত্যাদি ইত্যাদি।”( মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, সিলেটের ইতিহাস,  ১ম খণ্ড, সিলেট ১৯৯০)।

মুহম্মদ আসাদ্দর আলী এই সাঁইত্রিশ ভাগের অতিরিক্ত সিলেটের লোক সাহিত্যের আরও তেরটি উপবিভাগের নাম উল্লেখ করেছেন। যথা ১. আরি গান, ২. বিয়ের গান, ৩ রূপকথা, ৪. উপকথা, ৫. গাজির গীত, ৬. মালজোড়া গান, ৭. ধরাট গান, ৮. পির মুর্শিদী গান , ৯ ভাটিয়ালি গান, ১০. মেঘর গান, ১১. ফকিরালী বা ফউকরালী গান, ১২. মন্ত্র ও ১৩. হাপড়িয়া গীত।(মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, লোকসাহিত্যে জালালাবাদ, সিলেট ১৯৯৫)। হাওর-বাওর, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী ,বন- বনানী ঘেরা সিলেটঅঞ্চল লোকসাহিত্য/লোকগান/লোকসংস্কৃতির এক অসামান্য লীলানিকেতন। প্রকৃতিগতভাবেই এই জনপদের মানুষ সহজিয়া/ বাউল,সুফিবাদী মনের অধিকারী।

তাই, ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, এই অঞ্চলে বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান ও অন্য ধর্মালম্বীদের আগমন ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাবৈচিত্র্য এই অঞ্চলের     লোকমানুষকে দান করেছে অসামান্য কাব্যপ্রতিভা। এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে সাধু-সন্ত, পির-ফকির, সুফি-দরবেশদের আগমনে এই অঞ্চলের মাটি পূত-পবিত্র হয়েছে । বিশেষত, শাহজালাল, শাহপরানসহ তাঁদের সঙ্গীয় ৩৬০ আউলিয়ার/অনুচরের আগমন ঘটেছিল এই অঞ্চলে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে সুফিবাদী চেতনার রক্তধারা তখন থেকেই বহমান।  এছাড়া এই অঞ্চলে আগমন ঘটেছে সনাতনধর্মের সংস্কারক শ্রীচৈতন্যদেবের।সময়ের ধারাবাহিকতায় সহজিয়া তান্ত্রিক বৌদ্ধদের নির্বাণতত্ত্ব, মুসলমানের সুফিতত্ত্ব ও শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণবীয় তত্ত্ব দ্বারা বৃহত্তর সিলেট জনপদের মানুষ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলানিকেতন আধ্যাত্মবাদের উর্বর ভূমি সিলেটের মাটির গুণে এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন মরমিসাধক/লোকমহাজন/লোককবি, পরবর্তীকালে ভাব-সাধনার জগতে নিগূঢ়তত্ত্বের সন্ধান করেছেন তাঁরা। সিলেটের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর প্রবহমানতা, হাওরের ঢেউ তাঁদের হৃদয়ে সুরের ঝংকার তুলেছে। সেই সুর—সুরমা, কুশিয়ারা, মনু নদীর গা-ছুঁয়ে হাওরের লিলুয়া বাতাসে ভেসে বেড়ায় বিশ্বচরাচরে। সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের মনকে উদাস করেছে ,জাগতিক মোহ-মায়া তুচ্ছ করে তাঁদের বৈরাগ্যমন মানবতার জয়গানে উচ্চকিত হয়েছে। সেইসব লোককবি/মরমিসাধক মানুষ ও মানবতার কথা বলেছেন তাঁদের গানের স্বরে, হয়ে উঠেছেন সমন্বয়বাদী।

লোককবি/মরমিসাধকের  অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী ও সমন্বয়বাদী চেতনার রসে সিক্ত হয়েছে সিলেটঅঞ্চলের লোকগান/লোকসাহিত্য। আধ্যাত্মিক সাধনার লীলানিকেতন সিলেট অঞ্চলে মাজার কেন্দ্রিক ফকিরি গান, মারফতি গান, দেহতত্ত্ব গানের বিকাশ ঘটেছে/চর্চা হয়েছে। আবার আখড়া কেন্দ্রিক বাউল গান, কীর্তন গান ইত্যাদি গানের চর্চা দীর্ঘকাল যাবৎ চলমান। মধ্যযুগে বিথঙ্গল আখড়ায় সুফি/মরমিভাববাদী সাধকদের উত্তম স্থান ছিল। মরমি সাধনায় রামকৃষ্ণ গোঁসাই ও বিথঙ্গল আখড়ার ভূমিকা/অবদান সর্বজনবিদিত। রামকৃষ্ণ গোঁসাইর শিষ্য শ্যাম বাউল হবিগঞ্জের বর্তমান বানিয়াচঙ্গ উপজেলার গ্যানিংগঞ্জ বাজারের সন্নিকটে নির্জনস্থানে আখড়াবাড়ি স্থাপন করে মরমিসাধন ক্ষেত্র গড়ে তুলেছিলেন।  আখড়াটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে/৭০৩ হিজরি সনে বিখ্যাত সুফিসাধক হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬৯ জন আউলিয়া বা সফরসঙ্গী নিয়ে  আরবদেশ ইয়েমেন থেকে সিলেটে আগমন করেন। দরগা বা মাজার কেন্দ্রিক ফকিরিগান , দেহতত্ত্বের গানের চর্চা বহুকাল ধরেই সিলেটে প্রচলিত আছে। সিলেটের ভূপ্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকভাববাদীসংস্কৃতি জন্মদান করেছে অসংখ্য লোকসঙ্গীতস্রষ্টা/মরমিসাধক / লোকমহাজনের।  হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, শীতালং শাহ, দুর্বিন শাহ, আরকুম শাহ, শাহ আবদুল করিম, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, কামাল উদ্দিন,  মকরম শাহ, মকদ্দস আলম উদাসী, ছাবাল শাহ,  ফকির ইয়াছিন শাহ, খোয়াজ মিয়া,

ফকির সমছুল, শফিকুন্নুর, কফিলউদ্দিন সরকার, আবদুর রহমান, বশির উদ্দিন সরকার প্রমুখ মরমিসাধকগণ সিলেটের লোকসংগীতের পথিকৃতদের অন্যতম। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হয় সিলেটের লোকসাহিত্য লোকসংস্কৃতি লোকসংগীত সংগ্রহের ও আলোচনা শুরু হয়েছে সম্ভবত উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং এর বিকাশ বা প্ররসরণ ঘটেছে বিশ শতকের শুরুর দিকে। সেকালের সংগ্রাহকগণ বৈরী পরিবেশে অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে

দুর্গম পল্লীর পথে প্রান্তরে , হাটে মাঠে ছড়ানো ছিটানো লোকসাহিত্য ও সাংস্কৃতির অসংখ্য উপাদান,  উপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন। সিলেটের এই লোকসম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ,  বিকাশে যাঁরা পথিকৃৎ-এর ভূমিকা পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে

উল্লেখযোগ্য হলেন— 

অচ্যুতচরণ চৌধুরী, পদ্মনাথ ভট্টাচার্য, কৃষ্ণবিহারী রায় চৌধুরী, তারিণী চরণ দাস, জগন্নাথ দেব, গুরুসদয় দত্ত, মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, আবদুল আজিজ মাস্টার, ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন, রাজমোহন নাথ, মতিন উদদীন আহমদ, মুহাম্মদ আবদুল বারী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, আবদুল গাফফার দত্ত চৌধুরী, আবদুল জব্বার, চৌধুরী গোলাম আকবর, গোলাম কাদির,  আসাদ্দার আলী, মুহম্মদ হারুন আকবর,  নন্দলাল শর্মা প্রমুখ। পরবর্তীতে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে লোকসাহিত্য-লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ,সংরক্ষণ, ও চর্চার দুরহ কাজটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন—শামসুল করিম কয়েস, আহমদ সিরাজ,ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, দীপংকর মোহান্ত, স্বপন নাথ,ডক্টর শরদিন্দু ভট্টাচার্য, ডক্টর জফির সেতু, ডক্টর মোস্তাক আহমাদ দীন, সুমনকুমার দাশ, সজলকান্তি সরকার, মো. সুবাস উদ্দিন, পার্থ তালুকদার, সৈয়দা আঁখি হক প্রমুখ।  উল্লেখ্য, ফোকলোরবিদ সুমনকুমার দাশ সম্প্রতি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিশেবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সিলেটের লোকসাহিত্য-লোকসংস্কৃতি প্রসারে ও চর্চায় সিলেটের পত্রপত্রিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য।  বহুকাল ধরেই এই কাজটি ধারাবাহিকভাবে না-হলেও বিচ্ছিন্নভাবে চলমান।  ‘শ্রীহট্ট কাছাড় অনুসন্ধান সমিতি’ ১৯২৫ সালে ‘শিক্ষা সেবক’ পত্রিকা প্রকাশ করে, ‘শিক্ষা সেবক’ পত্রিকায় সিলেটের লোকসাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ১৩৪২ বঙ্গাব্দে শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ গঠিত হলে , সংগঠনটি বিভিন্ন প্রাচীন পুথি সংগ্রহ করে এবং ফোকলোর বিষয়ক প্রবন্ধ তাদের কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকা ‘ শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’য় প্রকাশ করে।এছাড়াও, শ্রীভূমি(১৯১৫), আল ইসলাহ (১৯৩২)শ্রীহট্ট দর্পণ, কমলা, দাসী, বঙ্গলক্ষ্মী, কাহিনীর, যুগভেরী,বাংলার শক্তি ইত্যাদি পত্রিকায় ফোকলোর বিষয়ক নিবন্ধ/প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিককালে সিলেট থেকে সুমন বনিক সম্পাদিত সাহিত্যের ছোটোকাগজ ‘অগ্নিশিখা’ ফোকলোর বিষয়ক  কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করে। এখানে উল্লেখ্য,  অগ্নিশিখা’ পত্রিকাটি ১৯৮৭ সাল থেকে প্রকাশিত হলেও,  সাম্প্রতিককালে বাউল এবং হাওরাঞ্চল ভিত্তিক লোকগান বিষয়ক সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। মোহাম্মদ জায়েদ আলীর সম্পাদনায় বেশ কয়েকজন মরমিসাধকের জীবনও সৃষ্টির আলোকে স্মরণপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। হবিগঞ্জের গৌতম চন্দ্র দাস সম্পাদিত “মরমীয়া’ সংকলনটি হবিগঞ্জ লোকসংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত হয়,২০১৯ সাল থেকে  সংকলনটি লোকসংস্কৃতি প্রসারে কাজ করছে। কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সিলেট অঞ্চলের লোকসাহিত্য-লোকসংস্কৃতি বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য — বাংলা একাডেমি, ‘নাগরী’প্রকাশন স্বত্বাধিকারী সুফি সুফিয়ান , ‘উৎস প্রকাশন’ স্বত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম, ‘চৈতন্য’ প্রকাশন স্বত্বাধিকারী রাজীব চৌধুরী ইত্যাদি। এসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো সিলেটের লোকসংগীত-লোকসংস্কৃতি বিষয়ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করেছে।

সিলেট অঞ্চলের লোকাসহিত্যচর্চা ও বিকাশে  আরও অসংখ্য গবেষক-সংগ্রাহক নিবিষ্টচিত্তে গবেষণা কাজ করে যাচ্ছেন। সিলেটের সমকালীন দৈনিক সংবাদপত্র, সাহিত্যের ছোটো কাগজগুলোতেও বিভিন্ন সময়ে লোকসাহিত্য-লোকসংস্কৃতি বিষয়ক মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশ করে থাকে। মূলত, সিলেটের ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্য  মানুষের লোকায়ত সত্তা ও মননে  অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনা প্রোথিত করেছে, যা সিলেটের  লোকসাহিত্য- লোকসংস্কৃতি চর্চায় ও বিকাশে  উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে,

সিলেট থেকে ফোকলোরের অনেক উপাদান সংগৃহীত হলেও তা সামগ্রিকভাবে কয়েক শতাংশমাত্র। প্রসঙ্গত বিশিষ্ট ফোকলোরবিদ মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য —

“যা সংগৃহীত হয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে সিলেটকে কেবলমাত্র বাংলাদেশের মধ্যেই নয়, অসংখ্য লোকসঙ্গীতসহ লোকসাহিত্য সম্পদের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমগ্র উপমহাদেশের মধ্যে বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। “


কৈফিয়ৎ:

সিলেট লোকসাহিত্যের রত্নভাণ্ডার। এখনকার লোকসংগীত- লোকসংস্কৃতি স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আবহমানকালের। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো সিলেটের লোকসাহিত্য-সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে।সিলেটের হাওরাঞ্চলে এবং নিভৃত গ্রামে লোকসংগীত-লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য পরমপরায় লালিত হলেও, অধিকাংশ গ্রামে- উপজেলা পর্যায়ে আজকাল সেই লোক- ঐতিহ্য লালনে-পালনে উদাসীনতা/অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে।উন্নয়ন নামক জোয়ারের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে গ্রামবাংলার হৃদপিণ্ডে। গ্রামগুলো নগরে রূপান্তরিত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত বাংলার রূপ- লাবণ্য। হারিয়ে গেছে গোপাট (গরু হাঁটার পথ), গয়নাঘাট(গয়না নৌকার ঘাট), খেয়া ঘাট, বটেরতল, রথের মেলা, পালকি—আরো কতো কী !

যাত্রাপালা , বিয়ের মেয়েলী গীত, বিয়েতে ধামাইল গীত, ঘাটুগান, মালজোড়া গানের আসর, রাতভর বাউলগানের আসর ইত্যাদি  গুরুত্ব হারাতে বসেছে। সিলেটে এখন আর ‘বিয়ের বাটা’ দেওয়ার প্রথাটি আর নেই,  যেটি একসময় বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বর-কন্যার বিয়ের আগে অথবা কোথাও কোথাও বিয়ের দিন প্রায়-মহল্লার পঞ্চায়েতের লোকজনকে এই বলে দাওয়াত দেওয়া হত- ‘পান তামাক খাইতায়, নৌশা/কইন্যা সাজাইতায়’। এইরকম অনেক লোকাচার এখন সমাজ থেকে উঠে গেছে।

এমন একটি সময় আসতে পারে যখন গ্রাম-গঞ্জে নয়, ভাটি বাংলায় নয়, এসব লোকসংস্কৃতি শুধু গ্রন্থিত সংকলনের পাতায়-ই টিকে থাকতে পারে ! এমনকী—ইতিহাসের বিচারিক অনুসন্ধান ও গবেষণায় এগুলো পুনরায় আবিষ্কৃত হতে পারে। কারণ, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান রীতিনীতির ক্ষেত্রে অনেক লোকসংস্কৃতি-ই হারিয়ে যেতে পারে-এরকম শঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া সমীচীন নয়। তবে, অবকাঠামোগত  উন্নয়নকে আমরা অস্বীকার কিংবা অবহেলা করতে পারিনা। তাই-বলে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এড়িয়ে বা নির্বাসনে পাঠিয়ে নয়, বরং  মননে ও চর্চায়  সংস্কৃতিকে লালন করে চিরায়ত ঐতিহ্য সমুজ্জ্বল রাখাই উৎকৃষ্ট জাতির পরিচায়ক।

বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক  আগ্রাসন চলছে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি এই আগ্রাসনের শিকার। যেহেতু সিলেটঅঞ্চল বাংলাদেশের নাভিকেন্দ্র, তাই সিলেটের সংস্কৃতিও এই আগ্রাসনের থাবায় বিপর্যস্ত। মূলত, আকাশসংস্কৃতির ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব, সর্বত্র পুঁজির বিস্তরণ, প্রযুক্তির সহজ লভ্যতা—এই আশঙ্কার প্রধান কারণ হতে পারে। ইন্টারনেট, মোবাইল প্রযুক্তি মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে, এগুলোর অপব্যবহার সংস্কৃতিচর্চার মূলে কুটারাঘাত করছে। যাদের হাত ধরে সংস্কৃতির নন্দনকানন পুষ্পশোভিত হবে—সেই তরুন প্রজন্ম আজ টিকটক,কনটেন্ট ক্রিয়েটর ! অপরদিকে, ভিনদেশী সিনেমা, টিভি চ্যানেলের সিরিয়াল আজ পরিবারের বিনোদনের খোরাকে পরিণত হয়েছে। পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ শিথিল হয়ে পড়ছে। সামাজিক  মূল্যবোধ ভেঙে ধীরে ধীরে সমাজকাঠামোতে শুরু হয়েছে একপ্রকার ভাঙন, সেই ভাঙনের সুর একান্নবর্তী সংসারেও গিয়ে ঠেকেছে। যার পরোক্ষ প্রভাবে লোকায়ত সংস্কৃতিতে নানারকম অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে।

ভিনদেশী অপসংস্কৃতির কবলে পড়ে সামাজিক আচার- অনুষ্ঠানে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। একসময়ে গ্রামবাংলার বিয়েতে মেয়েলী বিয়ের গীত,ধামাইল ইত্যাদি পরিবেশিত হতো, হালআমলে বিয়ের আগের রাতে ‘গায়ে হলুদ’/হলুদ সন্ধ্যা নামে  ডিজে পার্টি/ হিন্দিগানের কনসার্ট সেই স্থান দখল করেছে।

মরমিসাধক লোকগানেরস্রষ্টা উদাসমনে গান বাঁধেন  সুরারোপ করেন, তাঁর গানে মাটির সোঁদাগন্ধ মাখা, তাঁর গানে পরম মুর্শিদের সান্নিধ্য প্রাপ্তির আকাঙ্খা । হাল-আমলে অনেক শিল্পী লোকগান পরিবেশন- করতে-যেয়ে গানের মূল সুর থেকে সরে-যান, এমনকী গানের কথাও পাল্টে ফেলেন— কী ভয়ানক বিষয় !

লোকগানকে ফোকমিউজিক বলতে উনারা পছন্দ করেন, গানের ভাবার্থ না-বুঝে, গানের ভেতরে প্রবেশ না করেই গান পরিবেশন করেন।  আধুনিক মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের ঝাঁঝালো শব্দে বাউল পদকর্তার রচিত মূল ভাবধারার গানটির অপমৃত্যু ঘটে। চিরায়ত বাংলার মৃত্তিকাসংলগ্ন লোকগান পল্লীমায়ের কোল ছেড়ে শহরে এসে  ফোকমিউজিক নামধারন করেছে। ইউটিউব, ফেইসবুক পেইজসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক শিল্পী বিভিন্ন লোককবির গান পরিবেশন করে থাকেন। এসব পরিবেশনা নেতিবাচকভাবে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ লোকায়ত সংস্কৃতি ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা থেকেই শিল্পীরা চর্চা করছেন। কিন্তু, গানটি বিকৃত ভাবে পরিবেশন করা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। লোকসংগীত/লোকগান রচয়িতার-নাম নিয়েও অনেক সময়ে বিভ্রান্ত তৈরী হচ্ছে।প্রসঙ্গত ‘মালো মা, ঝিগো ঝি’; ‘মানুষ ধর মানুষ ভজ শোন বলিরে পাগল মন’সহ কয়েকটি গান কোক স্টুডিওসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চমৎকারভাবে উপস্থাপন ও পরিবেশিত হয়েছে। মূলত এসব পরিবেশনায় তথ্যগত ভুলের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। হরহামেশাই গানের উৎসের এরকম তথ্যগত ভুল সাধারণ শ্রোতাদের বিভ্রান্ত করে।, আরওএকটি গানের উৎস /স্রষ্টা নিয়ে বিতর্ক/ বিভ্রান্ত তৈরি হয়েছিল—’বুড়ি হইলাম তোর কারণে’ গানটির মূল শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া, যেটুকু আমরা জানি। আরও কয়েকজন শিল্পী এ গানটি এখনও পরিবেশন করে থাকেন। স্মরণ করছি নব্বই দশকে জনপ্রিয় এক শিল্পী তাঁর অ্যালবামের [সিডিতে ধারণকৃত] দ্বিতীয় প্রচ্ছদের তালিকায় ওই গানটি সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন- গীতিকার অজ্ঞাত, সংগৃহীত। অথচ গানের গীতিকার শেখ ওয়াহিদুর রহমান তখনও জীবিত।  সাম্প্রতিক সময়ে আবার বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল সিলেটি বিয়ের গান খ্যাত-‘আইলারে নয়া দামান আসমানেরও তেরা’-র রচয়িতা নিয়ে। যে বিতর্ক অনেক ধুম্রজাল সৃষ্টি করেছিল , জানিনা সেই ধোঁয়াশা এখনও কাটলো কি-না !  ‘এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া/ এত যত্নে গড়িয়াছে সাঁই’— কালজয়ী এই গানটির শিল্পী  আবদুল আলীম, গানটি এতটাই জনপ্রিয় যে এই গানটির গীতিকার যে রশিদ উদ্দিন, তা অনেকেই জানেন না ! অমন অনেক উদাহরণ আমাদের লোকসংগীতের উজ্জ্বলতা ম্লান করে দিচ্ছে। আমরা দেখতে পাই,  লোকায়ত সংস্কৃতিতে-লোকসংগীতে নানারকম অভিঘাত  সৃষ্টি হয়েছে এবং হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও আমরা বলতে পারি আবহমান বাংলার লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিকে  বাঁচিয়ে রাখা, লালন করা এবং সঠিকভাবে পরিচর্যা করা সময়ের দাবি। কারণ এখানেই প্রোথিত রয়েছে আমাদের জাতিসত্তার আসল ঠিকানা—আমাদের ঐতিহ্যের আতুরঘর। তা-না-হলে   নতুন প্রজন্ম শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মপরিচয়হীন জাতিতে পরিণত হতে পারে।

সহায়ক রচনাপঞ্জি  :
ক. গ্রন্থ

০১]  হাবিবুর রহমান:  বাংলাদেশের লোকসংগীত ও ভৌগোলিক পরিবেশ, প্রথম প্রকাশ- জুন ১৯৮২, প্রকাশক- বাংলা একাডেমি ঢাকা।
০২] নন্দলাল শর্মা : ফোকলোর চর্চায় সিলেট, প্রথম প্রকাশ- আগস্ট ১৯৯৯, প্রকাশক- বাংলা একাডেমি।
০৩] আজির হাসিব: লোকসাহিত্য লোকসংস্কৃতি,প্রথম প্রকাশ- ২০২০, প্রকাশক- নাগরী, বারুতখানা সিলেট।

খ. প্রবন্ধ

  ০১] স্বপন নাথ: সাম্প্রতিক প্রবণতা ও বাউল রশিদ উদ্দিন,  ‘অগ্নিশিখা’ সাহিত্যের ছোটোকাগজ, নবম সংখ্যা জুন ২০২৫, সিলেট।

.  .  .

সুমন বনিক
সুমন বনিকhttp://raashprint.org
সিলেট শহরের মহাজনপট্টিতে ৩১আগস্ট ১৯৬৭খ্রিস্টাব্দে জন্ম। কবিতার সঙ্গে পথচলা তিন দশকের। স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন।দেশের বাইরে বিভিন্ন ওয়েবম্যাগ, কাগজে নিয়মিত লিখছেন। কবিতার পাশাপাশি অসংখ্য ছড়া, কিশোরকবিতা, ছোটদের গল্প লিখেছেন । ১৯৮৭ সাল থেকে সম্পাদনা করছেন সাহিত্যের ছোটোকাগজ অগ্নিশিখা। ইতোমধ্যেই লিটলম্যাগাজিন 'অগ্নিশিখা' দেশ-বিদেশে পাঠক সমাদৃত হয়েছে।দীর্ঘদিন যাবৎ সম্পাদনা করছেন শারদ সংকলন "অরুণ আলোর অঞ্জলি'। প্রকাশিত কবিতাবই--জ্বলছি জলের তলে, প্রেমযোগ, অবেলায় ডোরবেল, প্রণয়সোহাগ, কিশোরকবিতা বই' রাতের গায়ে জোনাক জ্বলে', যৌথ ছড়ার বই 'ছড়ায় ছন্দে আড্ডাঘর'। পুরস্কার অর্জন: বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার ২০২৩, ও কাব্যকথা সাহিত্য পুরস্কার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত ।
এইরকম আরও পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
ad place