Thursday, March 26, 2026
Homeসবিশেষকবিতাসময়াবর্তন ও অন্যান্য । বেনজির শিকদার

সময়াবর্তন ও অন্যান্য । বেনজির শিকদার

মার্চ

মার্চ সেই মাস; যেমাসে আছে একটি অনির্বাণ সাত তারিখ।
যে সাতে বঙ্গবন্ধুর হস্তাঙুলে ছিল অনিবার্য স্বাধীনতার ডাক।
তার হিমালয়-সম তর্জনির আকাশবিদীর্ণ গর্জনে
অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা।

মার্চ সেই মাস;
যেমাসে আছে একটি অবগুণ্ঠিত পঁচিশ তারিখ!
যে পঁচিশের পৈশাচিক অন্ধকার—
অত্যোজ্জ্বল সূর্যকে আজও ঢেকে রাখতে সক্ষম।
কালো অধ্যায় হয়ে ঘৃণার্হের অমোঘ খেয়ালে
পঁচিশে-মার্চ আজও লেপ্টে আছে প্রতিটি জখমদেয়ালে।

অনুসন্ধিৎসু মনে মার্চ আমার প্রবল উদ্দামের নাম।
নিরীহ বাঙালির ওপর সশস্ত্র হামলা—
মার্চ মানেই ঘুরে দাঁড়ানো প্রবলতেজি মুক্তিসেনার ঘাম।

মার্চ স্বাধীনতার মাস; আমার জলবৎ শেকড়ের ভিত!
মার্চ এলেই মুক্তির স্বাদ পাই, স্মরি শহিদের আত্মদান;
আমি স্মৃতি ও প্রীতিকাতর বাঙালি—
বুকের সবটুকুজুড়ে দেদীপ্যমান অমূল্য অতীত।

ছলনার ছল

দূরে কিছু দেখা যায়, অদেখার ছলে;
মানুষটা নেই, তবু ছায়া পড়ে জলে।
মিশে গেছে তারকারা আকাশের বুকে
ঘরে ফেরা পাখিদের ভ্রম চোখে মুখে।

ছায়া থেকে চোখ ফেরে মায়াঘেরা মুখে
আনত একাকী কেউ ধুঁকছে অসুখে!
বাতায়ন ছোটো হয়ে মরে গেছে স্বর;
অনেকেরই অচেনা আপনার ঘর।

ঘর যদি পর তবু ধরে থাকা স্মৃতি
ধরে থাকা শত ঢেউ সাগর-উদ্ধৃতি!
সব দেখে ফিরে আসে গতির জাহাজ;
আলগোছে ডেকে বলে— দেখে যাও আজ!

দেখে যাও এ কেমন ছলনার ছল;
মানুষটা নেই, তবু ছায়া টলোমল।

খেয়াঘাটে কেউ নেই

শালিকের পায়ে ভর দিয়ে আছে, মানুষের মতো রেখা
শীত ছুঁইছুঁই অন্ধ বিকেলে– যায় না কিছুই দেখা।
মলিন মাছির ভনভনে শুনি প্রাচীন দিনের গান;
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই যেন– ধুকছে জলের প্রাণ!

শ্বাসরোধে যারা হারিয়েছে আশ- তাদের কথাই ভাবি
চিতার দহনে চারুশোকে আছে — অন্ধদিনের চাবি!
পিতার জখমে মাতৃযাতনা যাপন অঘোর ঘুমে;
আঁধার এখানে বসে আছে ঠায় আলোহীন মৌসুমে!

দূরের আকাশে ছোটো-ছোটো তারা মিটিমিটি কিছু আলো
আহত আত্মা বিলাপ বিধুর– জন্মজখমে কালো!
গুহা থেকে গৃহ বারোয়ারি সব ভুলেছে আপন পর;
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই যেন– মায়াহীন অণুস্বর।

চেতনার ঘুণে জীবিকার নুনে মানুষের যত ভ্রম
দিকভুলে যায় ছায়ার তরণী– গ্রাস করে অনুপম!
বেসাতির ভিড়ে মিছে অনাচারে লোভের ঘোড়াটি ছুটে;
ছোটো ছোটো ক্ষত বেড়ে অবিরত— ঘাই মারে হৃদপুটে!

হাতের বাঁধন আলগা হয়েছে, মনের জমিনে চর
চরের জমিতে চাষবাস নেই, ফুল ফলহীন ঘর;
সুবাস এখানে বৃত্তবন্দি মলিন এখানে মুখ
দিনে দিনে তাই কৃত্রিম হয় যাপন তরীর সুখ।

মৃত্যুও যেন আড়িপাতে রোজ জীবনের জয়গানে
হট্টগোলের হাভাতেরা হাসে কতিপয় কিছু দানে;
আধুনিক বলে ভুলে গেছি সব সাবেকি হিসেবপ্রথা
নিঠুর নিনাদে কিলবিল করে আঁধারের অমরতা।

বিবিধ ব্যাধির বঙ্কিমরেখা সময়ের কাঁধে বসে
বেসুরো বাজছে ইচ্ছের বাঁশি নিয়তি দম্ভদোষে;
দোদুল্যমান নৌকার বুকে ব্যথাতুর কত কথা
বুকের দেরাজে আলগোছে পোষা অনুপম নীরবতা।

কু-চেতনা যত লালসার ক্ষত আঁধার-চাষের ক্ষণ
মিথ্যেমদিরা পান করে হাসে– মানুষের আয়োজন!
ক্ষমতা-প্রণয়ে হাহাকার বাড়ে বিষাদের ঘন ঘ্রাণ;
মানুষ কোথায়? দেয় না তো কেউ গুণের দড়িতে টান!

জাবেদা খাতায় দূরগামী দোলা দৃশ্যত কিছু নাই
উলটো কাছিম হাতড়ে বেড়ায় মাথা গোঁজবার ঠাঁই;
মাধুকরী বেশ কবে হবে শেষ বিবর্তনের ধারা
মুখোমুখি তবু সংলাপহীন আদালত দিশেহারা।

মিছিলের মতো প্রহসন বাড়ে নির্ঘুম শতরাত
অগ্নিগর্ভা মহাকাল লেখে খড়গের ধারাপাত;
প্রগতিশীলের অনুবাদজুড়ে মূর্খের মনোগ্রাম
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই যেন শ্মশান সর্বনাম।

জলের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলাম– ভাবনার দোলাচল;
খেয়াঘাটে আজ কেউ নেই তাই, পারাপার হলো ছল!

সময়াবর্তন

এখানে জমেছে ঘরহারা মেঘ ওখানে জমেছে ধুলো
নিজের আয়না, নিজেই তাকালে ধরা পড়ে ভুলগুলো।
মুখোশ এখানে দরকারি খুব, মুখ সেই ছায়াপথ
এখানে মানুষ থাকে না এখন, আঁধারের দাসখত।

এখানে জমেছে বেদনার জল ওখানে দুখের সুর
কেঁদেকেটে মরি সুখের আঙিনা এখনও বহুটা দূর!
পরাজিত লোক পরাজিত মন পরাজিত আজ সব
জয়ের পীড়নে কেঁদে যায় রোজ পরাজিত অনুভব।

পরাজিত নই আমি—
আমার কাছে তো প্রণয় সত্য জীবন এখনও দামি।
সময়ের চাপে এই জীবনও ক্ষয়ে যাবে ঘোরপথে
সরে যাবো ঠিক মরে যাবো জানি তুমুল বেদনা-ক্ষতে।

জীবনের মানে বেঁচে থাকা নয় জীবনের মানে প্রীতি
সেই প্রীতিতেই চলে যেতে হয় মিছে এ উপস্থিতি!
কেউ তো থাকেনি সবাই উধাও ছিল যারা এই ভবে
প্রয়াত-ফুলের খবর জগতে রেখেছে কে আর কবে?

এই ভূমিজুড়ে ছিল যারা কাল আজ তারা ঠিক গত
চারপাশে দেখো ছড়ানো-ছিটানো স্মৃতিফুল কত শত।
যেখানে তোমার বসত এখন সেখানে একদা কেউ
পেতেছিল তার সংসারজাল গুনেছে সময়-ঢেউ।

নগ্ন হাসিতে মগ্ন হয়েই চিত্ত দুলিয়ে বাঁচা;
যাপনের দিন গত হলে পর পাখি ছেড়ে যায় খাঁচা।
নেই তারা কেউ তুমি আছো আজ, তুমিও তো যাবে চলে
অনন্তকাল কেঁদেছে মানুষ এমনি বিদায়-জলে।

কেঁদে নেই কোনো ফল—
বিদায়টুকুই শাশ্বত আজ, বাকি সবকিছু ছল।
এমনি থাকবে সাগর-ফোয়ারা উতলনদীর পানি
বাহির দখলে ভেতরে জমবে বারোয়ারি রাজধানী।

মানুষেরা যাবে মহাকাশ ফুঁড়ে অন্যদূরের গ্রহে
সামান্য এই পৃথিবীযাপন অনন্তবাস নহে!
ছেড়ে যেতে হবে এটুকু জেনেও চুপচাপ থাকি বসে
চোখের নিকটে কতলোক মরে কত যুগ যায় ধসে।

সময় হিরণ্ময়—
হারায়, আবার হারিয়েও যায়, থমকে থাকার নয়!
ভেসে যায় কত রাজার প্রাসাদ কীর্তিমানের কাজ
আসলে সবই মিথ্যেমোড়কে সময়-ফুঁয়ের সাজ।

অর্থহীন এ যাপনবিলাস অর্থহীন এ বাস;
সময় নিজেও সময়ের কাছে হয়েছে কোথাও দাস।
ফাঁকির খাতায় নাম লিখিয়েছি জাদুকরী এই মন
মায়ার মোহেতে আটকে ভেবেছি জনে জনে প্রিয়জন!

আসলে মানুষ একা—
হাজারবছর কেটে যায় তবু পায় না নিজের দেখা!

বিমূঢ়

বহু জন্মান্তর
হাতের তালুতে থুতনি গুঁজে শুয়ে আছি!

আমাকে ঘিরে আছে
একটি সময়খেকো গৃহগোধিকার বেঢপ মুখ;
শুনি বেহাগের আর্তনাদ, অদূরে কফিনের দুখ।

ভাঙছে ফণীমনসার বন,
তৈজসের ঘ্রাণে উড়ছে একজোড়া অন্ধ মধুমক্ষিকা।
মৃত কবিতাদের মাতমে কাঁদছে এক-টব ঘন পর্তুলিকা।

ছুঁয়ে দিতে অধরপল্লব
দিলরুবা-প্রেমে মাঝে মাঝে উঁকি দেয়
একফালি আগুনরঙা ময়ূখমালী ঠোঁট।

হতে চেয়ে বৃষ্টি, এ দৃষ্টি মেঘ হয়ে যায়;
হরণ করে ইচ্ছের দীপাবলি গালিবের মতো
শংকরপ্রবাহে আকণ্ঠ তৃষ্ণা করে পান।

নির্ঘুমরাতে জখমি স্বপ্নগুলো—
ধবল-শশকের মতো ধীরপায়ে হাঁটে
অসিতবর্ণ চোখ দু’খানি যেন এক দুঃখভেজা নর্তকী।

নারীর প্রণয় নয়—
সন্ধ্যার আহ্নিকে ভাসে বিধুর সংলাপ;
ফিরে যায় বেনামি চিঠি, গাঢ় কুয়াশায় ডোবে ডাগর শশধর।

এরপর আরও কিছু দুঃখ মাপতে—
হিজলের হাহাকারে বাটখারা সাজে;
অমিত্রাক্ষরে বাড়ে বেলা, হৃদয়ে নাটমন্দিরের উৎসব।

আমি কেবল—
হাতের তালুতে থুতনি গুঁজে শুয়ে আছি।

 

বেনজির শিকদার
বেনজির শিকদারhttp://raashprint.org
জন্ম টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুরে। ছোটোবেলা থেকেই কবিতার সাথে সখ্য। শৈশব কেটেছে যমুনা, ধলেশ্বরী, কালিগঙ্গা বেষ্টিত নির্জন প্রকৃতির কোলে। তিনি জীবন খুঁজে বেড়ান- বই প্রকৃতি সংগীত ও সাহিত্য-সংস্কৃতির মাঝে। বর্তমানে বেনজির শিকদার সপরিবারে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: নাকফুল (২০১৮), অনুভূতির মিছিলে ভালোবাসার জীবাশ্ম (২০১৯), দ্যুতিবিথার (২০২২), বীর্যের বেদনা (২০২৩), দ্বিপ্রহরের দ্বিধা (২০২৪) sikder_belji@yahoo.com
এইরকম আরও পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
ad place