স্কুলের ছোট্ট ক্লাসের জানালা দিয়ে যে বড় ক্লাস দেখা যায়,সেখানে যে বড়দের দল,গলাগলি ফিসফিস করে, মনে হতো জীবনের অপার রহস্য তাদের কাছেই। তাদের ক্রস উড়নার আড়ালে যুবতী স্তন,হা হা হি হি হাসতে হাসতে ঢলে পড়া, কানাকানি ছোট্ট দৃষ্টিতে বোধ হতো সেটাই গন্তব্য জীবনের।মাঝের ঐ বিশাল সবুজ গালিচা মাঠ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছে গেলেই বোধহয় জানা হবে জীবনের সবটুকু। কী অপার আকাঙ্ক্ষা, কী তৃষ্ণা…তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। আমিও একদিন তাদের মতো বড় হবো। বালিকা থেকে নারী। না দেখে ফেলে যাওয়া বড়দের দল যেদিন আবিষ্কার করবে আমি তাদেরই একজন, সেদিনই বোধহয় আমি আমি হবো। আমি বড় হবো। বড় হওয়াই একমাত্র সাধনা জীবনের। বড়দের জন্য স্কুল গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে মজনুরা। যেদিন আমার এমন মজনু হবে, সেদিন বুকের ভেতর সুগন্ধি রুমাল রাখার মতো বড় হবো আমি,সেদিনই আর কিচ্ছু থাকবে না চাওয়ার,কিচ্ছু থাকবেনা পাওয়ার বাকি।
না খুব দীর্ঘ সময়তো নয়। চোখের পাতা ফেলতে না ফেলতেই যখন পৌঁছে গেলাম ‘আমি তখন নবম শ্রেণি, আমি তখন ষোলো’র বেঞ্চে, জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বিশাল সেই মাঠ, যাকে অতিক্রম করতে হাঁফিয়ে যেতাম একদা,সেই মাঠটি কবে ছোট্টটি হয়ে গেছে! দেখলাম ছোট্ট মাঠ পেরিয়ে ছোট্ট ক্লাসের জানালা গলে ঠিক একজোড়া অবাক দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে আমি আবিষ্কার করি আমাকে। অবিকল আমি। আজকের আমার কাছে পৌঁছানোর সেইদিনের আমার যে আকুলতা, তার দৃষ্টিতেও একই আকুলতা । ‘বিস্ময়ে ভ্রমি’র অপেক্ষায় থাকা দৃষ্টিকে আমার মায়া হয় খুব৷ বড়দের সারিতে বসলে দায়িত্ব এসে কাঁধে চাপে, পরীক্ষার চাপ উদ্বিগ্ন করে। উদ্বিগ্ন করে, অশান্ত করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা।
আহা ঐ অপ্রাপ্তবয়স্ক দৃষ্টি জানেনা, জানেনা যে এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ। আহা এই চেয়ে থাকা জানেনা পথ ফুরিয়ে গেলে যেখানে পৌঁছানো যায়, গন্তব্য যার নাম… সেখানেই সব কঠিনের শুরু,সেখানেই সব সহজের শেষ। সেখানেই শেষ অপাপবিদ্ধ আনন্দের,যে আনন্দের নাম জীবন। জীবন থেকে সব সহজ হারিয়ে গেলে সেই সহজের আক্ষেপে দিন কাটিয়ে দেয়ার নামই জীবন।
আমরা বড় হই। যতোটা চাই তার চেয়েও বেশি বড়। জীবন জটিল হয়। জটিল জীবনে সত্য রূঢ় হয়। জানা হয় সব চাওয়া কখনোই পাওয়া যায়না।কেন পাওয়া যায়না, সেই সত্যও উন্মুক্ত হয়ে যায় বড়বেলার বুদ্ধির কাছে। বড় নির্মম এই সব জেনে যাওয়ার নির্মমতা।
অথচ জীবন ছিলো সেই সহজ দিনগুলোতেই, যখন সহজলভ্য সহজ কিংবা জীবন কিছুরই মানে ছিলোনা। ভোরবেলায় যে ভোর হতো চা মুড়ির গন্ধে। তেরছা করে রোদ ঢোকে যেতো পূবের দরজা দিয়ে রান্নাঘরের মাটিতে। আছড়ে পড়ে জানান দিতো ধেয়ে আসছে প্রয়োজন, জীবনের প্রয়োজন। কিন্তু বালিকার তা বোঝার দায় ছিলো না। পরিবার আগলে রাখা অভিভাবকের দল। মা পাখির ডানার নিচে বাচ্চা পাখির কিচিরমিচির করা অনর্থক দিন যাপনে ছায়া ফেলতে পারেনা জীবনের কোন জটিলতা।
এলমুনিয়ামের হাড়িতে জ্বাল দেয়া চা কাপে ঢালতে ঢালতে মায়ের শাখা পলায় ঝুলতে থাকা সেফটিপিনে বাধা থাকতো সব সমাধান। ফ্রকের বোতাম যদি ছিঁড়ে যায় কিংবা পাজামার ফিতে পথ হারায় মায়ের হাতে রয়েছে তো নির্ভরতা। কী যে জরুরি ছিলো মায়ের সে হাত। যে জীবনে মা থাকে, সে জীবনে আর কিছুর দরকারই পড়েনা।মায়ের হাতে বেড়ে দেয়া চা মুড়ির চেয়ে প্রিয় কোন ভোরের গন্ধ নেই এখনো আমার কাছে। সেই ভোরে কাঠ কয়লায় দাঁত মেজে বিছানায় বই মেলে বসলে মা এনে সামনে দিতেন সেই অমৃত। কারো কি এখন দিন শুরু হয় চা মুড়ি দিয়ে, গ্রামে কিংবা শহরে? সন্ধান পেলে ছুটে যাবো। চা মুড়ির জন্য ছুটে যেতে হয়না। চাইলেই পাওয়া যায়। সরিষার তেল মাখা মুড়ি আর এক কাপ চা সহজলভ্যই খুব। কিন্তু সহজলভ্য নয় সময়ের অনুভূতি। অনেক চা অনেক মুড়ি… কিছুতেই ফিরে আসে না ফেলে আসা সময়ের ভালো লাগা। মায়ের মমতার ছোঁয়া হীন চা মুড়ি কেবলই খাবার,উদরপূর্তির উপকরণ। টের পাই চা মুড়ি হারাইনি। হারিয়েছি সময়ের সহজতা। সহজতার সারল্য, সারল্যের ভালো লাগা। এ এক মোহময় কর্পূর। ঘ্রাণ ছড়িয়ে দিয়ে কোথায় মিশে যায়।বাকি জীবন তার সাথে জলের মতো ঘুরে ঘুরে কেবল কথা কওয়া। আর ধরা যায়না…ছোঁয়া যায়না…।
জানি যা যায় আর ফেরেনা কখনো। সুইমিংপুলের নীল জলে কখনোই ফেরেনা পুকুরের শ্যাওলা সবুজ জলের উদ্দাম দুপুর। দল দল শৈশব কৈশোর। ঝাঁপিয়ে পড়া।অনতিদীর্ঘ দুপুরকে এই জলের গায়েই বিকেলে ঠেলে দেয়া।মায়ের তাড়া।পথ চলতে চলতে আমি উন্মুখ হয়ে পুকুর খুঁজি এখন। ঝাঁক বাঁধা মাছের পোনাদের অভয়ারণ্য পুকুর, শ্যাওলার ঘ্রাণ মাখনো বাতাসের নীরব ঘুঙুর বাজানো পুকুর। বড় দুর্লভ এখন।
পৃথিবীর সব পুকুর ডুবে গেছে উন্নয়নে কিংবা বিলাসের প্রাচূর্য্যে। সাথে নিয়ে গেছে বালক বালিকার উদ্দাম শৈশব। মাটি ফুঁড়ে এখন সজল স্রোত নয়, গড়ে উঠে ইমারত। কঠিন ইট পাথরের ইমারত। যে ইমারতে কোন ছিদ্র নেই মায়ার, আবেগের। কঠিন সেই ইমারতের জটিল ম্যাপে ম্যাপে মানুষের জীবনের জটিলতা। দক্ষ আর্কিটেক্ট এর গেঁথে দেয়া।
তবু এই নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ছেড়ে এখনো গ্রাম হয়ে পড়ে থাকা কোন জনপদের অচেনা পথ ধরে হাঁটতে গেলে হঠাৎ দেখা মেলে এক শান্ত দীঘির অপ্রয়োজনীয় পড়ে থাকা, দীঘির জলে কার ছায়া! স্মর্তির! সেই শ্যাওলার ঘ্রাণ। নুয়ে পড়া গাছের ডালের জলের সাথে মাখামাখি। ব্যস্ততাকে প্রতারণা করে একটা দুরন্ত মূহুর্ত তখন টুপ করে ঢোকে পড়ে স্মৃতির কপাট খুলে। আমি সন্ধান পাই সমবয়সী হল্লার সেই জল ঝাপটানো দুপুর, একসাথে সাঁতার কাটা মাছের গা থেকে নিজের গায়ে লেগে যাওয়া মৎসগন্ধ। যে মৎসগন্ধার অনিবার্য ডাকে যৌবন আসে, আসে মনহরা যুবরাজ।সেই যুবরাজ এখন যে কোন পুরুষ। একই চোখ কিন্তু দৃষ্টিতে সামাজিক শীতলতা। যে শীতলতায় যা কিছু থাকুক, কোনকালে প্রেম ছিলো কল্পনায়ও আসে না।
কতো দুপুরের গায়ে লেগে আছে একান্নবর্তী কাঁসার থালা, গ্লাস। মাটিতে সারিবেঁধে বসা। ঘি মাখা আলুভাজি মুগডাল আর মেথি ফোঁড়ন দেয়া ঝোলে কাতলা মাছের পেটি। মা দিয়ে যাচ্ছেন পাতে পাতে। কতো সহজ ছিল মাছের টুকরো নিয়ে তুতো ভাইবোন দের ঝগড়াঝাটি । রাগ করে না খাওয়া দুপুর। রুই কাতলার এ দিন ছিলো বড় আনন্দের দিন। রাজকীয় খাবারের। আর বাকি দিনগুলো দিন এনে দিন খাওয়া ট্যাংরা,পুঁটি। রসুনমাখা কাঁচামরিচে জুঁইফুল ভাত ফুটে থাকতো লোভের জিহবা ছুঁয়ে। মনে হতো শেষ না হোক এই দুপুর,এই স্বাদ। একজনের রোজগার পনেরো জনের হাড়ি। শুধু ভাতের যোগানটুকু হয়ে গেলেই সবাই মনে মনে জানতো, যাক আর চিন্তা নেই। শুধু ভাতের প্রয়োজনটাই শুধু প্রয়োজন ছিলো যখন। আজ যে ব্যুফে লাঞ্চ আর স্টারের কাচ্চি গ্রাস করেছে দুপুরের লোকমা, কোথায় যেনো খুব ক্লান্তি। যেনো চাওয়ার মতো কোন গন্তব্য নেই। যাওয়ার মতোও। এই হৈ হৈ রেস্টুরেন্ট লাঞ্চ আর টেবিলে পঞ্চব্যাঞ্জনের গন্ধে অরুচি ধেয়ে এসে গিলে খায় খাবারের ইচ্ছে। পেটের খিদে মেটানোর সহজ আনন্দ হারিয়ে গেছে হরেক রকম রেসিপির বাহুল্যে। ভাতের প্রয়োজনের চেয়ে কত বড় বড় প্রয়োজন গ্রাস করেছে দৈনন্দিন দিন। ভাত হয়ে গেছে সবচেয়ে গৌণ প্রয়োজন। জীবনে যখন ভাতের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় জীবন তখন কঠিনের সমার্থক হয়ে যায়। অথচ কী ভুলেই না আমরা ভাবি জীবন বুঝি ভাতের অভাবই বোধহয় সবচেয়ে বড় সংকট জীবনের!
মায়ের তন্দ্রার ঘোর ফাঁকি দিয়ে পাড়ার সমবয়সীদের খেলার হল্লায় আমাদের বিকেল নামতো স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে। সাদাকালো বিটিভিও ঢোকেনি তখনও টিনের চালার বসতঘরে। আশ্চর্য বিকেলগুলো আনন্দে ঝলমল করতো গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধার হারজিতের ঘামে। সার্থক হয়ে উঠতো অর্থহীন ঝগড়াঝাটিতে। তারপর কখন যে টম এন্ড জেরির অতিবুদ্ধির কৃত্রিম আনন্দ রঙে ঢঙে ঢেকে দিলো আমাদের নিষ্পাপ বিকেল। আমাদের কাছে বড় হয়ে উঠলো বড় হওয়া। পাড়ায় পাড়ায় কোচিং সেন্টার,আমাদের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার তাড়ায় ডুবে গেলো সমবেত আনন্দের বিকেল। আমাদের পাড়ার পাড়ার মাঠগুলো চলে গেলো হাই রাইজ উন্নয়নের দখলে।
সন্ধ্যা নামতো অপার্থিব আজানে। ঘড়ি এক বিলাসী দ্রব্য, আসন গাড়েনি ঘরের দেয়ালে, দেয়ালে। মসজিদের মাইকে বাজতো সন্ধ্যার আবাহন। পাড়াময় উলুধ্বনি আর ঝাঁঝ কাসর। ধুপ ধুনোর পবিত্র অন্ধকার। আজ এবেলায় ভাবি, মুসলমানের আজান কী অদ্ভুতভাবে হয়ে উঠতো ত্রিসন্ধ্যায় হিন্দু বাড়ির সন্ধ্যা প্রদীপের নির্দেশক। পাড়ার মসজিদে মুয়াজ্জিন মাগরিবের আজান দিলে সন্ধ্যা হয়, তাড়া করে বাড়ি ফেরার তাড়া। ততোক্ষনে মায়ের চিমনি মোছা শেষ। কেরোসিনের গন্ধে তীব্র ঘুম আর স্বপ্নরা হানা দিতো বইয়ের পাতায় পাতায়। জানালার পাশে হাস্নাহেনার ভেসে আসা গন্ধে রাত নিঝুম হতো। উত্তর পাড়ার সুলেখাদির রেওয়াজের সুর থেমে উচ্চকিত হতো একটানা পড়ার সুর। শব্দ বলতে তখন সেই শব্দই। রাস্তায় টুং টাং রিক্সার আওয়াজ থেমে যেতো দ্রুত, থেমে যেতো মানুষের গতির প্রয়োজন। হঠাৎ কান পাতলে কোন যুবকের ছয় ব্যান্ডের রেডিও থেকে মূর্ছনা তুলতো,সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান দুর্বার…সারেং-এর সুর…ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া। পাঠ্যবই বন্ধ করে তুমুল বড় হয়ে উঠার সাধ জাগতো। আহা বড় হওয়া। যতোটা বড় হলে দুর্বারের গান শুনতে থাকলে কেউ বকতে আসেনা। পরদিন স্কুলের পড়া করার তাড়া থাকেনা। সেই বড় হওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষাতেই গড়াতো দিন।
আমাদের বাইরঘরে যে আড্ডা বসতো প্রতিদিন সন্ধ্যায় রাজা উজির মরতো দাবার বোর্ডে কিংবা কথার খৈয়ে। তাতে আমার জানা হতো সারা বিশ্বের খবর। কিছু তার বুঝি, কিছু বুঝিনা। কোথাও তারকা যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে কিংবা জোট নিরেপেক্ষ বলেও কোন জোট আছে। বিস্কুট বলতে প্যাকেটের ছোট্ট নাবিস্কো আর গরুর দুধে জ্বাল দেয়া চা। বাইর ঘরের আড্ডার অপেক্ষায় পড়তে বসা এক টুকরো সন্ধ্যা যেনো নড়তো না। টুংটাং সাইকেলের আওয়াজে যখন একজন দুজন এসে জমতো একে একে, পাড়াতো কাকা কিংবা অফিসের কলিগ, মায়ের শাসন তখন ঢিলে ঢালা হতে শুরু করতো, মাও কান পেতে থাকতো অচিন দেশের খবরের সন্ধানে । জীবনের অপরিমেয় আনন্দ তো এই ফসকে যাওয়া সন্ধ্যাটাই।
টিমটিমে আলোর নিচে সারিবাঁধা পিড়িতে ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে বালিশের নিচ থেকে ডাকতো ডালিমকুমার, সুঁই রাজকন্যা। ডাইনি বুড়ির নিষ্ঠুরতার গল্প পড়ে চোখের জলে যখন ঘুম নামতো, বাবা নিশ্চয়ই আলোটা নিভিয়ে দিতেন তখন। বাবাই তো হাতে তুলে দিয়েছিলেন বইয়ের মতো আনন্দের সন্ধান। আরেকটু বড়বেলায় দুর্গার মৃত্যুতে কান্না এসে গলায় আটকে থাকার অসহনীয় যাতনার সুখ কিংবা অধরা মাসুদ রানার প্রেমে পড়ার সুখ আর দেবদাসের কষ্টে নিজেকে পারুর জায়গায় প্রতিস্থাপিত করার বেদনার সুখ বড়বেলায় অধরা হয়ে গেলে উপলব্ধি করি সহজ কথা যখন সহজে বলা যেতোভ,তখনই কেবল জীবন ছিলো জীবনের মতো। কত সহজ কারণে হাসা আর কত সহজ কারণে কাঁদা।
হাতে যেদিন প্রথম জ্যামিতিবক্স এলো, সেদিন নিজেকে বোধ হয়েছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। কতোবার যে লাল প্যাকেট থেকে খুলে খুলে দেখা স্কেল কম্পাস। জীবনের বড় বড় অনেক প্রাপ্তিতে সেই ছোট্ট বাক্স হাতে পাওয়ার আনন্দ আর ফিরে না।
ফেলে আসা জীবনের সহজ আনন্দের বাঁকে বাঁকে আমরা কেবল বড় হতে চেয়েছি। বাবার কাছে চেয়ে নতুন জুতাজোড়া পাইনি। পাইনি পছন্দের স্কুল ব্যাগটা। না পাওয়ার যতো আফসোস বড় হয়ে ঘুচিয়ে দেবো। জীবনের প্রয়োজনে আমরা বড় হই, না পাওয়াও হয়তো ঘুচে যায়। আর সব পেতে পেতে জানা হয়, জীবনের সুখ এই পাওয়ায় নয়। বরং চাওয়ার আকুলতায়। কোথায় হারিয়ে যায় এই সহজ চাওয়ার আকুলতা!
আমরা বড় হই। যতোটা চাই তার চেয়েও বেশি বড়। জীবন জটিল হয়। জটিল জীবনে সত্য রূঢ় হয়। জানা হয় সব চাওয়া কখনোই পাওয়া যায়না।কেন পাওয়া যায়না, সেই সত্যও উন্মুক্ত হয়ে যায় বড়বেলার বুদ্ধির কাছে। বড় নির্মম এই সব জেনে যাওয়ার নির্মমতা।
যতোদিন এই নির্মমতা না জেনে চাওয়ার আকুলতা ততোদিনই জীবন জীবন থাকে। আর বাদবাকি দিন কেবল যুদ্ধের কৌশল নির্ণয়, শকুনির মতো ধূর্ততায়…।

রুমা মোদক (জন্মঃ ৭ মে ১৯৭০) একজন কথাসাহিত্যিক, থিয়েটার কর্মী এবং নাট্যকার। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১১ টি। তারমধ্যে ১ টি কাব্যগ্রন্থ, ৬ টি ছোটগল্প সংকলন, ৩ টি নাট্যসংকলন ও ১ টি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থ। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ থিয়েটার কর্মী ও নাট্যকার। তাঁর রচিত মঞ্চায়িত নাটকের সংখ্যা প্রায় ২০ টি। নাট্যকার। বাংলাদেশের কথা সাহিত্যের এক ভিন্ন স্বর তিনি। ধর্ম ও জীবনের মিথষ্ক্রিয়ায় বাংলাদেশের মানুষের জীবনে যে অমোঘ বিপন্নতা আমরা দেখি সেই ছবিটি তার গল্পে আঁকতে চান তিনি, যেন উত্তরকালের জন্য বিশ্বাসযোগ্য এক ডকুমেন্টেশনে নেমেছেন। বর্তমানে তিনি দেশ বিদেশের নানা প্রিন্টিং ও অনলাইন মাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জগৎজ্যোতি দাসকে নিয়ে তাঁর রচিত মঞ্চনাটক ‘জ্যোতিসংহিতা’ ঢাকা, সিলেট সহ ভারতে বহুবার প্রদর্শিত হয়। থিয়েটারভিত্তিক দেশের খ্যাতনামা সাময়িকী ‘থিয়েটারওয়ালা’র ৩৩তম সংখ্যায় স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে থিয়েটারের ইতিহাসে নির্বাচিত সেরা পঞ্চাশটি নাটকের মধ্যে স্থান পেয়েছে ‘জ্যোতিসংহিতা’। রুমা মোদক হবিগঞ্জ জেলার বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা করেন। যায় যায় দিন প্রতিদিনে সাব ইডিটর হিসেবে কর্মজীবনের শুরু, বর্তমানে তিনি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।
