ভাঙা-ভাঙা শব্দে কথা বলে তনুশ্রী। বয়স আড়াই বা তিন হবে। তার পাকা পাকা কথায় মনে হবে বুড়ি একটা।
যত বায়না— আবদার বাবার সাথেই সব। মাকে ভয় পায় তেমন কিছু না, তবে বাবাকেই গুরুত্ব দেয় তনুশ্রী।
পিঠের ওপর ঘোড়া চড়া, ট্যাবে গেম খেলা, বিছানায় শুয়ে-শুয়ে রান্নাবাটি খেলা বা গল্প শোনা সবই বাবার সাথে। এমনই একদিন শুয়ে-শুয়ে বাইরের জানালার দিকে তাকিয়ে বাবাকে জিজ্ঞাস করলো— বাবা, বাতাস নড়তেছে কেন?
বাবা— গাছের পাতা মা!
—গাছের পাতা নড়বে কেমন করে বাবা? বাতাসের জন্য পাতা নড়তেছে।
—ও তাই তো, হ্যাঁ মা।
তনুশ্রী আরো ভারী, আরো আদুরে গলায় বলল— তুমি কিচ্ছু বোঝ না, তুমি ‘টম’হয়ে যাচ্ছ বাবা।
বৃষ্টি হচ্ছে এমন সময় বাবার ঘরে ফেরা। তনুশ্রী— এদিকে আসো বাবা, এই দেখো— আমাকে তো খালি-খালি বকা দাও। এখন বৃষ্টিকে বকে দাও দেখি!
—কেন মা? বাবা অবাক হলেন।
—দেখতেছ না বৃষ্টি আমাদের জানালা, ঘর সব ভিজায়ে দিছে।
—তাই ত! বৃষ্টির কী সাহস!
— বৃষ্টি এইরকম সবার ঘর ভিজায়ে দেয়, বাবা?
— হুম!
—কেন? কেউ বৃষ্টিকে বকা দেয় না?
—না।
—তুমি বকা দিবে।
—আচ্ছা, মা।
—এখনি দাও….
বেড়ানোর জন্য তনুশ্রীড় প্রিয় জায়গা নানুর বাসা। ও ওই জায়গাটাকে ‘নাইকল দাদুর বাসা’ নামে ডাকে। মূলত জায়গাটার নাম রায়নগর। কিন্তু সে তা শর্টকাটে ‘নাইকলদাদুর বাসা’বলে চালিয়ে দেয়। তার এই শিশুমুখো নামটা নানুরও খুব প্রিয়। ‘নাইকলদাদু’ বলা মাত্র নানু তাকে আদরে জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু নানুর আদরের চেয়েও তনুশ্রীর আগ্রহ অন্যখানে। নানুর বাড়িতে পাখি আছে একজোড়া। হাঁস আছে, মুরগী আছে। বিড়াল আছে। ছুটির দিনে এরা হলো তনুশ্রীর খেলার সাথী।
এইদিকে নানুর বাড়িতে শাদা ও সোনালি রঙা দুইটা বাচ্চা হয়েছে বিড়ালের, যা দেখে তনুশ্রী বায়না ধরে বসলো, ছানা দুইটার একটাকে সে বাসায় নিয়ে যাবেই। তার বায়না মানে— অটল, নাছোড়! ফেরানো যাবে না কোনোভাবেই। অতএব বিড়ালের একটা বাচ্চা সাথে নিয়ে ফিরতেই হলো ঘরে।
ঘণ্টা দুয়েক পরে যখন বাসায় ফিরার সময় হলো, দেখা গেল বিড়াল-পাখিটা নাই! মা-বিড়াল আছে। সোনালী বিড়াল ছানাটি আছে। হাঁস আছে। মুরগী আছে। এক জোড়া পাখি আছে। শুধু বিড়াল-পাখি নাই! কোথায় গেল? তনুশ্রীর খুব কান্না পেল। অনেক খোঁজা হলো। কিন্তু বিড়াল-পাখির দেখা পাওয়া গেল না আর। দেখা গেল, মা-বিড়ালটি খুব রিল্যাক্সড হয়ে বসে আছে ঘরের একপাশে, তার সোনালী বিড়াল-ছানাটি নিয়ে। সবাই ব্যপারটাতে খুব অবাক হলো। অবশেষে খোঁজাখুঁজিতে কোনো কাজ না হওয়ায়, তনুশ্রীর কান্নাকাটি ম্যানেজ করে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো সবাই।
তনুশ্রী খুব খুশি। সারাদিন সে ছানাটি নিয়ে ব্যস্ত। সে বিড়ালছানাটির নাম দিয়েছে ‘পাখি’। তনুশ্রীর বাবা তনুশ্রীকে পাখি নামে ডাকে। মা-ও তাই। মানে এইবার ঘরে দুইটা পাখি হলো। তনু-পাখি। বিড়াল-পাখি। ‘আমার পাখিটা কই রে’ সারাদিন এই ডাকটা যেন ঘরের দেয়ালে দেয়ালে উড়ে বেড়ায়।
নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে তনুশ্রী এখন তার পাখিটাকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত। কিন্তু বিড়াল-পাখি সারাদিন ম্যাঁও-ম্যাঁও শব্দে ঘর মাথায় তুলে রাখছে। কোনোভাবেই তারে শান্ত করা যাচ্ছে না। সে কি এইখানে ভাল নেই?
ছয়-সাত দিনের মাথায় ‘বিড়াল-পাখি’টাকে ফেরত দেয়ার জন্য নাইকল দাদুর বাসায় যাওয়া হলো। বাচ্চাটা তার মা-বিড়ালকে পেয়ে নানান রকম খেলায় মেতে উঠল এবং মায়ের আদরে আদরে অনেকটা সময় পার করলো। বিড়াল-পাখি ও তনু-পাখি দুজনই এবার শান্ত।
তনুশ্রী নানুর সাথে নানান রকমের গল্প করছে। আর নানু তার সব কথাতে সায় দিয়ে যাচ্ছেন। নানু জানো— সেদিন আমি আর বাবা বৃষ্টিকে এত বকা দিলাম!
—কেন?
—ও কেমন দেখ! কিছু না বলে অন্যের ঘর, জানালা ভিজায়ে দেয়।
—ও তাই! হো হো হো…. নানু হেসে উঠলেন!
ঘণ্টা দুয়েক পরে যখন বাসায় ফিরার সময় হলো, দেখা গেল বিড়াল-পাখিটা নাই! মা-বিড়াল আছে। সোনালী বিড়াল ছানাটি আছে। হাঁস আছে। মুরগী আছে। এক জোড়া পাখি আছে। শুধু বিড়াল—পাখি নাই! কোথায় গেল? তনুশ্রীর খুব কান্না পেল। অনেক খোঁজা হলো। কিন্তু বিড়াল-পাখির দেখা পাওয়া গেল না আর। দেখা গেল, মা-বিড়ালটি খুব রিল্যাক্সড হয়ে বসে আছে ঘরের একপাশে, তার সোনালী বিড়াল-ছানাটি নিয়ে। সবাই ব্যপারটাতে খুব অবাক হলো। অবশেষে খোঁজাখুঁজিতে কোনো কাজ না হওয়ায়, তনুশ্রীর কান্নাকাটি ম্যানেজ করে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো সবাই।
রাস্তায় তনুশ্রী বাবাকে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলো।
পাখিটাকে কি কেউ কিডন্যাপ করল, বাবা?
কেউ লুকিয়ে ফেলল, বাবা?
বিড়াল-পাখিটা কি আমাদের সাথে আর থাকবে না?
বিড়াল-পাখি কি নিজে থেকে লুকিয়ে গেল, বাবা?
ও বাবা, বিড়াল-পাখিকে কেউ মারে নাই ত?
বাবার পক্ষে এত সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেয়া সম্ভব হলো না। যা বললেন উত্তরে, তা তনুশ্রীকে মোটেও সন্তুষ্ট করলো না। মন খারাপ করে ভিজা চোখে তনুশ্রী ঘরের দিকে চললো।
ঘরে ঢুকতেই তনুশ্রীর চিৎকার বাবাআআআ— আমার পাখিটাকে পেয়ে গেছি বাবা। পাখিটা একা একাই বাসায় ফিরে এসেছে।
পাখিটাকে পাখির কোলে দেখে তার বাবার চোখও ছানাবড়া।
রচনা : ১৮ মে ২০১৮
…

জন্ম ১৯৭৮ সালের ৫ জানুয়ারি, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী শহর সিলেটে। তবে তাঁর বংশপরিচয়ের সূত্র টানলে ফিরে যেতে হয় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’র কাছে-যার পারিবারিক রক্তধারা তাঁর শরীরেও বহমান। শৈশব ও বেড়ে ওঠার স্মৃতিতে সিলেট যেমন একটি ভৌগোলিক নাম, তেমনি একটি সাংস্কৃতিক ও আবেগী পরিমণ্ডল। বর্তমানে তিনি পেশাগত কারণে সপরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
তিনি বিষাদমুক্ত জীবনবোধে আস্থাশীল, ভ্রমণপ্রিয় এবং বন্ধুবৎসল মানুষ হিসেবে পরিচিত। বহুমাত্রিক সৃজনশীলতায় সক্রিয় সায়েম একাধারে কবি, সম্পাদক, পুস্তকপ্রকাশক, স্থিরচিত্রগ্রাহক এবং স্বতঃপ্রণোদিত তথ্যচিত্রনির্মাতা। আবির্ভাবকাল অনুযায়ী তিনি একবিংশ শতকের প্রথম দশকের লেখকপ্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি- অনক্ষর ইশারার ঘোর (২০১৫), কয়েক পৃষ্ঠা ভোর (২০১৯) এবং রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ (২০২৫)। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ The Layers of Dawn। প্রকাশিতব্য দুইটি কবিতার বই রয়েছে, যা খুব শীঘ্রই বের করার প্রস্তুতি চলতেছে। একটি ‘কবিতার খাতায় আঁকা ফিুড়ং’ এবং ‘আব্বার আনন্দবাজার’ নামে।
তিনি সম্পাদনা করছেন সাহিত্যপত্র সূনৃত এবং ওয়েবম্যাগ রাশপ্রিন্ট।
ছোটকাগজ সম্পাদনার জন্য ২০১৩ সালে তিনি অর্জন করেন ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস’ সম্মাননা।
প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী ফিলাডেলফিয়ায় ‘বইমেলা২০২৫’ মতো একটি আয়োজন, যার সাথে তিনিও আয়োজকদের একজন ছিলেন। এবং ‘ফিলাডেলফিয়া’ নামের সাহিত্য পত্রিকাটি তিনি সম্পাদনা করেন।
সায়েমের নানা বাড়ি হচ্ছে সিলেটের মামনফুর এলাকায়। নানার নাম সৈয়দ মোস্তকিন আলি
বিষাদমুক্ত, ভ্রমণপ্রিয়, বন্ধুবৎসল। ফোন : +1 (929) 732-5421 ইমেল: ahmedsayem@gmail.com
