বৃষ্টিই হচ্ছে। অন্য কোনো শব্দই আর কানে যাচ্ছে না; এই ঝুনঝুন শব্দগুলো-যে কত মধুর তা শুধুমাত্র আয়েশ করে এককাপ লিকার নিয়ে বসলেই মাপা যায়। রাত বাড়ছে আর বৃষ্টির শব্দ যাচ্ছে শৈশবের খেলাঘরে, যেখানে কিছু রঙ-করা কাগজ নিয়ে খেলতে যে-শব্দের দেখা পাওয়া যেত, তা এখনো কানে বাজে; ঐ দিনটা ও ছিল একই মিছিলে আবৃত্ত। বৃষ্টি তার নিয়মেই আছে, সময়ের উচ্চতায় রুচির বদল ঘটেছে যা। ভাইবোন মিলে কাগজের নৌকায় ঘুরেছি সারাটা শহর। বিছানায় বালিশের উপরে বসে করেছি রাষ্ট্রশাসন। সারাটা ঘর ডুবিয়ে দিয়েছিলাম শুধু বৃষ্টির পানিতেই। আজ যা নিজের বাচ্চাদের চরিত্রে দেখে হাসি পায়। আমরা যা বদলে গেছে বলে তকমা দেই, আসলে তার কিছুই ঘটেনি। বৃষ্টি নিয়ে তো তারাও আনন্দে আছে, নৌকা বানিয়ে দিয়েছি, ওরা যার যার বিছানায় বসে-বসে শহরটারে ঘুরে দেখছে। সব গল্প যদি একই হয় তবে আর গল্প বলে লাভ কী। বৃষ্টি হচ্ছে, হবে, একই বৃষ্টি, দেখার ভঙ্গিটা একটু ভিন্ন তো হতেই হয়। যদি গল্পের ভিন্নতা না হতো, আমরা এখনো রবীন্দ্রনাথের বৃষ্টিতেই ভিজতাম। বৃষ্টি যেভাবেই ঝেঁপে আসুক তার মর্ম মাটির ভিন্নতায় ভিন্ন আকারেই বার্তা দিয়ে আসবে, যেমন এখন আমার বোন — সে তার বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে আটকে আছে, যাতায়াতের জন্য কোনো যানবাহনই পাচ্ছে না। বন্ধু জাকির ঘরে বসে রবীন্দ্রনাথের গান শুনছে …
এমনো দিনে তারে বলা যায়
এমনো ঘনঘোর বরিষায় —
এমনো মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।।সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারিধার।
দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার —
জগতে কেহ যেন নাহি আর।।সমাজ সংসার মিছে সব,
মিছে এ জীবনের কলরব।
কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয় দিয়ে হৃদি-অনুভব —
আঁধারে মিশে গেছে আর সব।।বলিতে ব্যথিবে না নিজ কান,
চমকি উঠিবে না নিজ প্রাণ।
সে-কথা আঁখিনীরে মিশিয়া যাবে ধীরে,
বাদলবায়ে তার অবসান —
সে-কথা ছেয়ে দিবে দুটি প্রাণ।।তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার
নামাতে পারি যদি মনোভার!
শ্রাবণবরিষনে একদা গৃহকোণে
দু-কথা বলি যদি কাছে তার
তাহাতে আসে যাবে কিবা কার।।আছে তো তার পরে বারো মাস —
উঠিবে কত কথা, কত হাস।
আসিবে কত লোক, কত-না দুখশোক,
সে-কথা কোনখানে পাবে নাশ —
জগৎ চলে যাবে বারোমাস।।
কাকতালীয়ভাবে একই গনের আবৃত্তি শুনছিল তাহমিনা; এমন দিনে তারে বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরিষায় — /এমন মেঘস্বরে / বাদল-ঝরঝরে / তপনহীন ঘন তমসায়… যে একসময় আমার ভালো বন্ধু ছিল, এখনো সে বন্ধুই আছে কিন্তু এখন আর কোনো রঙমহলের আলাপ হয় না। তবে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মাঝেমধ্যে ফোনালাপ হয়ে, যে-আলাপ নতুন কোনো রঙ তৈরি করতে পারে না, রঙের রঙটাই শুধু বলে দেয়া যায়।
আমরা যে-সময়টায় বৃষ্টিতে ভিজে একাকার তখন অন্য ল্যান্ডে, মানে লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ার নামের চব্বিশতলা ভবনে মূহুর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে আগুন, যা অনেক স্বপ্ন নিভিয়ে দিতে সাহায্য করল, কতজন যে কতরকমভাবে ছিলেন, মা হয়তো তার বাচ্চার সাথে খেলছিলেন, অন্য কোনো বাচ্চা হয়তো তার দাদুর সাথে গল্প করছিল, কেউ হয়তো তার ভাইয়ের সাথে ফোনে আলাপ করছে আবার কেউ তার প্রিয় কোনো মানুষের সাথে মোবাইলচ্যাটে ব্যস্ত…। বড়ই নির্মম এই বার্তা। বৃষ্টির শব্দের সাথে আগুনে পোড়া গন্ধ, তা কোনোভাবেই যায় না। কিন্তু না-যাবার অত কিছু নেই। একই সময়ে যদি দুই রকম ঘটনা ঘটেই থাকে লেখায় তো তার রেশ থাকবেই। ধারাবাহিকতা থাকবে কেন? আমাদের বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে জ্বর আসছে আর ওরা কেউ কী কখনো ভেবেছিল যে আর কিছুক্ষণ পরেই এমন মর্মান্তিক স্পর্শে আটকে যাবে তাদের ঘড়ির কাঁটা, ঘরের দেয়াল, চাবির রিং, নাকফুল আর ল্যাপটপে রাখা কত প্রিয়-মানুষের কথা আর তাদের ছবিগুলো! চব্বিশতলা বিল্ডিং, কম বড় ব্যাপার না। আমাদের গরিব দেশের হয়তো দুই মহল্লার মানুষ জায়গা হচ্ছিল ওখানে। ভাবা যায় দুইটা মহল্লার মানুষ বা পঞ্চাশটা ফ্যামিলিই যদি ধরি; একসাথে এতটা মানুষ, গোছানো সংসার, পুড়ে একেবারে হাওয়ায় মিশে গেল! ও-মাই-গড, কোনোভাবেই ভাবা যায় না। তাদের কেউ কী ভাবছিলেন কখনো …
শুনেছি মৃত্যুর আগে সবাইকেই প্রকৃতি থেকে কিছুনা কিছু মেসেজ দেয়া হয়, দেয়া হয় বা পেয়ে যান — একটাকিছু তো মানতেই হয়। মেসেজের বিন্দুবিসর্গগুলো কেউ পড়তে পারে, কেউ দেখিয়ে যায় তার সংগ্রহশালা। ওরা তবে কী মেসেজ বহন করছিল? কাছাকাছি থাকলে হয়তো জানা যেত কার কী রঙ আর কী ছিল তাদের নিশ্বাসে, জ্ঞানে।
তারা তো তাদের মেসেজে চলে গেলেন, তো? হ্যাঁ, প্রকৃতি সবসময়ই চতুর্মুখী মেসেজ দেয়, আমরা শুধু একটাই পড়তে পারি যা দেখা যায়। মুখ দেখার জন্য আয়নার সামনেই দাঁড়াই অথচ একবারও ভাবি না আয়নার পিছনের গল্প কত লম্বা। গ্রেনফেল টাওয়ার থেকে আমরা কী মেসেজ পেলাম! বা আমাদের কর্মের কী কোনো ত্রুটি আছে বা আশা-জাগানিয়া কোনো গল্প, যা দিয়ে জগতের দর্শনগুলো আঁকা হবে আরো স্পষ্ট করে। আমরা আলোকিত মানুষ খুঁজি, কিন্তু কখনো নিজের আলোটাকে দেখি না। আবার অন্যকে যে-জ্ঞান দেই তা কখনোই নিজের আমলে থাকে না বিধায় এত এত দিতে পারি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে দুইটা লাইন এখানে তুলে রাখি —
কী জানি কী হলো আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ —
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
ওরে, চারিদিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর —
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর।
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।।
ভিন্ন মাটিতে ভিন্ন সময়ে আরেকটু ভিন্ন গল্পে দেখা গেল বাংলাদেশের রাঙামাটির বুকে পার্বত্য এলাকায় আরেকটা ভয়াবহ ভূমিধস, এবং এখানেও দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু। প্রকৃতি বারবার — নানান রকমে বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় মানুষকে, কিন্তু কেন? তাদের কত নানান গল্প ছিল। নানান রাশিতে বাঁধা ছিল তাদের জন্ম। অথচ যাবার বেলায় একটা মাত্র ব্যানারে সবার গল্পের সমাপ্তি! সময়ের ছুটির ধরন নানান রঙে সাজানো। কেউ হাসতে হাসতে হারিয়ে যায় কেউ কান্নার নির্মাণ দেখে ঠিকানা পেয়ে যায়। জীবন একটা রঙমহল, কান্নাহাসির দর্শন আর তথ্য নিতে নিতেই সৃষ্টি হয়ে যায় অন্য একটা অবস্থার প্রেক্ষাপট। আমরা হয়তো তার একটা কাব্যিক নাম দেই অথবা খুঁজে নেই সন্ধ্যার নরম আলো।
এই গদ্যের সাথে হয়তো যায় না, আর যাবেই না-কেন, এই গদ্যটা লিখতে-লিখতেই তো নব্বই দশকের একটা গান খুব মনে পড়ছে। অতএব এখানে তা তুলে রাখছি। আসলে একটা কিছু ভাবতে গেলে আরো নানান কিছু ভাবনায় আসে, কিন্তু আমরা তা আনি না, কারণ তা তো এই গদ্যে যায় না। পড়তে গেলে বেখাপ্পা লাগবে। কিন্তু আমার মনে হয় যতই বেখাপ্পা লাগুক যা আসে তা তুলে রাখা প্রয়োজন, একটা সিরিয়াস ভাবনার সাথে আমাদের মন আরো কতরকমভাবে খেলা করে তা পাঠক জানবে না কেন। গানটার লেখক কামরুজ্জামান কামু। গেয়েছেন আরেক শক্তিমান গায়ন সঞ্জীব চৌধুরী।
তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা
যে-বাক্য অন্তরে ধরি
নাই দাঁড়ি তার নাই কমা
ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।তীর্থে তীর্থে বেড়াই ঘুরি
পন্থে পন্থে বেড়াই ঘুরি
মনকে ব্যাকাত্যাড়া করি
মনের মেঘ তো সরে না
তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।দাঁড় টেনেছি দাড়ির সঙ্গে
তীর ভেঙেছি তারই রঙ্গে
কী বিভঙ্গ নারীর অঙ্গে
পুষ্পে মধু ধরে না
তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।বর্ষা দেখাও, গ্রীষ্ম দেখাও
শীত বসন্ত শরৎ দেখাও
স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ শেখাও
উম ছাড়া শীত মরে না
তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।
কামরুজ্জামান কামু-র গান — তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও / করি প্রেমের তরজমা … গানটি নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি এই গদ্যে; অন্য কোনো লেখায় কথা বলা হবে এই ভরসায় এই লেখায় নিয়ে রাখলাম। একেবারে যে কথা বলা হয়নি তাও কিন্তু না। ভালোবাসার মানুষকে প্ল্যান করে যেমন বলতে হয় না ভালোবাসি, ঠিক তেমন কথাই বলেছি গানটি নিয়া। মানে গদ্যটা লিখতে গিয়ে অনেকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে গানের কথা ও সুর। তাই গানটি আপন করে রাখার জন্যই নিজের লেখায় নিয়ে রাখা। অন্য কোনো সময়ে এই নিয়ে আলাপ করা হবে।

জন্ম ১৯৭৮ সালের ৫ জানুয়ারি, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী শহর সিলেটে। তবে তাঁর বংশপরিচয়ের সূত্র টানলে ফিরে যেতে হয় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’র কাছে-যার পারিবারিক রক্তধারা তাঁর শরীরেও বহমান। শৈশব ও বেড়ে ওঠার স্মৃতিতে সিলেট যেমন একটি ভৌগোলিক নাম, তেমনি একটি সাংস্কৃতিক ও আবেগী পরিমণ্ডল। বর্তমানে তিনি পেশাগত কারণে সপরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
তিনি বিষাদমুক্ত জীবনবোধে আস্থাশীল, ভ্রমণপ্রিয় এবং বন্ধুবৎসল মানুষ হিসেবে পরিচিত। বহুমাত্রিক সৃজনশীলতায় সক্রিয় সায়েম একাধারে কবি, সম্পাদক, পুস্তকপ্রকাশক, স্থিরচিত্রগ্রাহক এবং স্বতঃপ্রণোদিত তথ্যচিত্রনির্মাতা। আবির্ভাবকাল অনুযায়ী তিনি একবিংশ শতকের প্রথম দশকের লেখকপ্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি- অনক্ষর ইশারার ঘোর (২০১৫), কয়েক পৃষ্ঠা ভোর (২০১৯) এবং রুদ্ধজনের রাগ ও সম্বিৎ (২০২৫)। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ The Layers of Dawn। প্রকাশিতব্য দুইটি কবিতার বই রয়েছে, যা খুব শীঘ্রই বের করার প্রস্তুতি চলতেছে। একটি ‘কবিতার খাতায় আঁকা ফিুড়ং’ এবং ‘আব্বার আনন্দবাজার’ নামে।
তিনি সম্পাদনা করছেন সাহিত্যপত্র সূনৃত এবং ওয়েবম্যাগ রাশপ্রিন্ট।
ছোটকাগজ সম্পাদনার জন্য ২০১৩ সালে তিনি অর্জন করেন ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস’ সম্মাননা।
প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী ফিলাডেলফিয়ায় ‘বইমেলা২০২৫’ মতো একটি আয়োজন, যার সাথে তিনিও আয়োজকদের একজন ছিলেন। এবং ‘ফিলাডেলফিয়া’ নামের সাহিত্য পত্রিকাটি তিনি সম্পাদনা করেন।
সায়েমের নানা বাড়ি হচ্ছে সিলেটের মামনফুর এলাকায়। নানার নাম সৈয়দ মোস্তকিন আলি
বিষাদমুক্ত, ভ্রমণপ্রিয়, বন্ধুবৎসল। ফোন : +1 (929) 732-5421 ইমেল: ahmedsayem@gmail.com
